পাখিহীন হাওর, একটি অশনিসংকেত

আপলোড সময় : ২৫-০১-২০২৬ ০৯:২৫:২৯ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৫-০১-২০২৬ ০৯:২৫:২৯ পূর্বাহ্ন
বিশ্ব রামসার হেরিটেজ সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর মানেই একসময় ছিল শীতের অতিথি পরিযায়ী পাখির কলরব, ডানা ঝাপটানোর শব্দ আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। কিন্তু আজ সেই টাঙ্গুয়ার হাওর নীরব। শীত এলেও নেই অতিথি পাখির আগমন। হাওরের বুকজুড়ে যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা - যা শুধু পর্যটন বা সৌন্দর্যের ক্ষতি নয়, এটি দেশের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা। পরিযায়ী পাখি প্রকৃতির ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা শুধু সৌন্দর্য নয়, জলাভূমির স্বাস্থ্য নির্ণয়ের অন্যতম সূচক। টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখির অনুপস্থিতি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়- এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ গভীর সংকটে রয়েছে। নির্বিচারে পাখি শিকার একসময় এই বিপর্যয়ের বড় কারণ ছিল - এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও স্থানীয় নজরদারির ফলে পাখি শিকার প্রায় বন্ধ হয়েছে। তারপরও পাখিরা ফিরছে না। অর্থাৎ সমস্যার শিকড় আরও গভীরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিজল-করচ, নলখাগড়া ও চাইল্যা বনের দ্রুত উজাড়, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, জলদূষণ, মাছ আহরণে অতিরিক্ত চাপ এবং জলজ উদ্ভিদের ধ্বংস - সব মিলিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র ভেঙে পড়েছে। পাখিরা আসে নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের খোঁজে। সেই পরিবেশ যদি না থাকে, শিকার বন্ধ হলেও তাদের ফেরার কোনো কারণ থাকে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, একসময় দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও টাঙ্গুয়ার হাওর দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল। আজ পাখির অনুপস্থিতিতে সেই পর্যটনও মুখ থুবড়ে পড়ছে। এতে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও জাতীয় সম্পদ - সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কোর ও বাফার জোনে ইঞ্জিনচালিত নৌযান নিষিদ্ধসহ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বিচ্ছিন্নভাবে নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, হাওরের বনভূমি পুনরুদ্ধার, জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে স¤পৃক্ত করাই হতে পারে টাঙ্গুয়ার হাওর রক্ষার টেকসই পথ। টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু সুনামগঞ্জের নয়, এটি বাংলাদেশের গর্ব, বিশ্বের স¤পদ। এই হাওর পাখিহীন হয়ে পড়া মানে আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থার ব্যর্থতা প্রকাশ পাওয়া। এখনই যদি কার্যকর ও আন্তরিক উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম টাঙ্গুয়ার হাওরকে চিনবে শুধু ইতিহাসের পাতায়, একটি হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্যের নাম হিসেবে। প্রকৃতপ্রস্তাবে, পরিযায়ী পাখির ফেরার পথ খুলে দিতে হলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নতুন করে ভাবতে হবে। নইলে নীরব টাঙ্গুয়ার হাওরই আমাদের জন্য চূড়ান্ত সতর্ক সংকেত হয়ে থাকবে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com