নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা : এখনই রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার প্রয়োজন

আপলোড সময় : ২০-০১-২০২৬ ০৯:৩২:১৪ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২০-০১-২০২৬ ০৯:৩২:১৪ পূর্বাহ্ন
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। একদিকে উৎপাদনের পরিসংখ্যান বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষকের জীবন ও জীবিকা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহার, বাজারব্যবস্থার বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার অভাবে কৃষক আজ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশাজীবী শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় ‘নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলন’-এর উত্থাপিত ফসলের বিমা, কৃষকের ঝুঁকি ভাতা চালুসহ ২০ দফা দাবি শুধু সময়োপযোগী নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মুখপাত্ররা যে বাস্তবচিত্র তুলে ধরেছেন, তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- বর্তমান কৃষি উন্নয়ন ধারা কতটা কৃষকবিমুখ ও পরিবেশবিরোধী। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদের বক্তব্য বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। তিনি যথার্থই বলেছেন, উৎপাদন বাড়লেও কৃষক আত্মহত্যা করছে, ক্যানসারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং রাসায়নিকনির্ভর ও মুনাফাকেন্দ্রিক কৃষিনীতির অনিবার্য পরিণতি। এই সংকটের বাস্তব উদাহরণ আমরা প্রতি বছরই দেখি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে। আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভাঙার কারণে কৃষকের চোখের সামনেই হাজার হাজার হেক্টর বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল ধ্বংস হয়ে গেলেও তাদের জন্য নেই কার্যকর ক্ষতিপূরণ, নেই ফসল বিমা, নেই ঝুঁকি ভাতা। ফলে কৃষক ঋণের বোঝা নিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে, পরিবারসহ মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়। প্রশ্ন হলো- যে কৃষক দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তার নিজের জীবন ও জীবিকা কি রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ? ‘নিরাপদ কৃষি ও খাদ্য আন্দোলন’-এর ২০ দফা দাবি এই প্রশ্নেরই একটি সমন্বিত উত্তর। কৃষকের মর্যাদাসহ স্বীকৃতি, কৃষিজমি সুরক্ষা, স্থানীয় বীজ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নির্ভরতা কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষক পেনশন ও ফসল বিমা চালুর মতো দাবিগুলো কোনো বিলাসী চিন্তা নয় - এগুলো টিকে থাকার ন্যূনতম শর্ত। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা হাওর, উপকূল ও চরাঞ্চলের জন্য ফসল বিমা ও ঝুঁকি ভাতা চালু করা এখন আর বিকল্প নয়, এটি জরুরি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের মাটির স্বাস্থ্য। ৭২ শতাংশ মাটিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি এবং ৬০ শতাংশ জমিতে জিংকের অভাব শুধু কৃষির সংকট নয়, এটি জনস্বাস্থ্যেরও বড় হুমকি। মাটি অসুস্থ হলে খাদ্যও বিষাক্ত হবে এবং তার প্রভাব পড়বে পুরো সমাজে। তাই নিরাপদ কৃষি মানে শুধু কৃষকের সুরক্ষা নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষা। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ২০ দফা দাবিকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহারে নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার স্পষ্ট রূপরেখা না থাকলে উন্নয়নের সব দাবি অর্থহীন হয়ে পড়বে। উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন কৃষক বাঁচবে, মাটি বাঁচবে, পানি বাঁচবে। রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমরা কি শুধু উৎপাদনের সংখ্যা বাড়াতে চাই, নাকি মানুষের জীবন ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে একটি ন্যায্য ও নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই? সুনামগঞ্জের হাওরের ফসলডুবির ঘটনা আমাদের প্রতিবারই সেই প্রশ্নটি নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com