এক সময় সকাল হলেই শিশুদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠত হাওরপাড়ের ছোট ছোট বিদ্যালয়গুলো। কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, চোখে স্বপ্ন আর মনে সীমাহীন কৌতূহল নিয়ে ছুটে আসত শিশুরা। আজ সেই বিদ্যালয়গুলো নীরব। তালাবদ্ধ দরজার ভেতর জমে উঠছে ধুলো, ভেঙে পড়ছে দেয়াল, আর অযতেœ হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের আশার আলো।
সুনামগঞ্জ জেলার ছয়টি উপজেলায় নেদারল্যান্ডস সরকারের অর্থায়নে নির্মিত ১০৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে পড়েছে। যেসব বিদ্যালয় তৈরি হয়েছিল দরিদ্র ও প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে, সেগুলোই আজ তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। শিক্ষা যেখানে ছিল আশ্রয়, সেখানে এখন অনিশ্চয়তা।
এই বিদ্যালয়গুলো শুধু ইট-সিমেন্টের ভবন ছিল না। এগুলো ছিল হাওরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জীবনের প্রথম সিঁড়ি। অনেক শিশু এখানেই প্রথম কলম ধরেছিল, প্রথম নিজের নাম লিখেছিল। আজ বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই শিশুরা কেউ দূরের স্কুলে যেতে গিয়ে ক্লান্ত, কেউ বা আর যায়ই না। অজান্তেই ঝরে পড়ছে তারা - কেউ হাওরে মাছ ধরে, কেউ কৃষিশ্রমিকের কাজে জড়িয়ে পড়ছে। একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার আলো থেকে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, এসব বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলেও কেউ যেন দায় নিচ্ছে না। বছরের পর বছর পড়ে থাকা ভবনগুলো আজ জীর্ণদশার শিকার। কোথাও গবাদিপশুর খামার, কোথাও মানুষের বসবাস। যেন শিক্ষা নামের স্বপ্নটিকে আমরা নিজেরাই অপমান করছি। কোটি টাকার অবকাঠামো নষ্ট হওয়া যেমন বেদনার, তার চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক - শিশুদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।
এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে দুর্গম এলাকায় গিয়ে শিশুদের পড়িয়েছেন, আজ তাঁরা বেকার। সাবেক শিক্ষিকা নিরালা বেগমের মতো অনেকেই এখনো অপেক্ষায়- যদি আবার স্কুল খোলে, আবারও তাঁরা শিশুদের হাতে তুলে দেবেন জ্ঞানের আলো। এই অপেক্ষা শুধু একজন শিক্ষিকার নয়, এটি একটি জনপদের দীর্ঘশ্বাস।
আমরা কি সত্যিই এতটাই অসহায় যে, শতাধিক বিদ্যালয় এভাবে নীরবে বিলীন হয়ে যাবে? সরকার, প্রশাসন, সমাজ - কারো কি দায় নেই? বিদ্যালয়গুলোকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়া, স্থানীয় কমিউনিটির মাধ্যমে চালু করা কিংবা সীমিত পরিসরে হলেও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা - এমন কোনো উদ্যোগ কি নেওয়া যায় না?
শিশুদের শিক্ষা কোনো প্রকল্পের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। আজ যারা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে, আগামী দিনে তারাই হয়ে উঠবে অবহেলার শিকার একটি প্রজন্ম।
এখনো সময় আছে। বন্ধ দরজাগুলো আবার খুলে দেওয়া যায়। ধুলোমাখা বেঞ্চে আবার বসতে পারে শিশুরা। হাওরের বাতাসে আবার ভেসে আসতে পারে পড়ার শব্দ। শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছা আর দায়িত্ববোধ। কারণ যেখানে স্কুল বন্ধ থাকে, সেখানে শুধু ভবন নয়, ভবিষ্যৎও বন্ধ হয়ে যায়।