হাওর শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রতি বছর দেশের বোরো ধানের একটি বড় অংশ আসে এই হাওরাঞ্চল থেকেই। অথচ সেই হাওরের কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যা, কর্দমাক্ত গোপাট, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা - সব মিলিয়ে হাওরের কৃষি এক অনিশ্চিত সংগ্রামের নাম। এই বাস্তবতায় হাওরে গোপাট পাকাকরণ, থ্রেসিং ফ্লোর ও সানিং ফ্লোর নির্মাণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।
গোপাট হাওরের কৃষকের জন্য জীবনরেখা। দুর্গম হাওর থেকে কাটা ধান পরিবহনের একমাত্র ভরসা এই পথ। আগাম বন্যা বা পাহাড়ি ঢলের সময় গোপাট দিয়ে দ্রুত ফসল সরানো সম্ভব না হলে কৃষকের মাসের পর মাসের শ্রম এক নিমিষে পানিতে ভেসে যায়। ফলে গোপাট পাকাকরণ মানে শুধু একটি অবকাঠামো নির্মাণ নয় - এটি ফসল রক্ষা, সময় বাঁচানো এবং কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি কার্যকর হাতিয়ার।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বাস্তবায়নাধীন প্রায় ৫শ কোটি টাকার প্রকল্পে হাওরের গোপাট উন্নয়ন, থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর নির্মাণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। এর মাধ্যমে দুর্গম হাওরে দ্রুত ধান মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে একদিকে যেমন ফসল নষ্টের ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে কৃষকের সময় ও ব্যয় উভয়ই সাশ্রয় হবে। বিশেষ করে দুর্যোগকালীন এসব থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর কৃষকের জন্য আশ্রয় ও সহায়তার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
তবে বাস্তবতা হলো- হাওরের প্রকৃতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই এই উন্নয়ন কার্যক্রম হতে হবে জলবায়ু সহিষ্ণু, টেকসই এবং হাওরবান্ধব। কেবল আরসিসি ঢালাই করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। গোপাটের পাশের জলাধারগুলোকে প্রবহমান রাখা, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি না করা এবং নৌ-যোগাযোগের সুবিধা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় অভিজ্ঞ কৃষক, হাওর বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের পরামর্শ গ্রহণ অপরিহার্য।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। অতীতে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পই দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে কাক্সিক্ষত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। হাওরের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রতিটি টাকা কৃষকের স্বার্থেই ব্যয় হয়।
প্রথম ধাপে সীমিত কিছু হাওরে কাজ শুরু হলেও ভবিষ্যতে জেলার সব গুরুত্বপূর্ণ হাওরে পর্যায়ক্রমে গোপাট উন্নয়ন জরুরি। কারণ প্রতিটি হাওরের নিজস্ব গোপাট রয়েছে এবং প্রতিটিই কৃষকের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
হাওরের গোপাট পাকাকরণ, থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর নির্মাণ - এই উদ্যোগ যদি পরিকল্পিত, টেকসই ও দুর্নীতিমুক্তভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা হাওরাঞ্চলের কৃষিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। এটি শুধু কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে না, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও দৃঢ় করবে।