দৈনিক সুনামকণ্ঠ মানেই সুনামের সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা। ২০০১ সালের ১৩ জুলাই সাপ্তাহিক হিসেবে যাত্রা করা এই পত্রিকাটি টানা ২৫ বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে, যা নিঃসন্দেহে বিরল ও দৃষ্টান্তমূলক অর্জন। সংবাদপত্র প্রকাশ, সম্পাদনা, সংবাদ সংগ্রহ, মুদ্রণ ব্যয়, সংবাদকর্মীদের সম্মানি ও অফিস পরিচালনাসহ বিপুল ব্যয়ভার বহন করে একটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা মোটেও সহজ নয়। তবুও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সুনামকণ্ঠ আজও পাঠকের আস্থার জায়গায় অটল রয়েছে। সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে কিছু বাস্তব সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট মহল অনেক সময় সাংবাদিককে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে। শুরু হয় রোষানল, জন্ম নেয় অসহায়ত্ব। লাঞ্ছনা, হুমকি, বঞ্চনা এমনকি মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি এবং নিঃস্ব করার চেষ্টাও নতুন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সংসার চালানোর কঠিন বাস্তবতা। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও সাংবাদিকতায় টিকে থাকা সত্যিই চ্যালেঞ্জের। মূলত সাংবাদিকতা একটি সমাজকে জাগ্রত করা ও সম্মাননির্ভর পেশা। একে বলা হয়ে থাকে সমাজের দর্পণ। অবৈধ অর্থ বা কালো টাকার লোভে পা বাড়ালেই পেশার মূল চেতনা বিনষ্ট হয়। মানহানির ঝুঁকি এখানে নিত্যসঙ্গী। তবে সততা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে পারলে সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। একজন প্রকৃত সংবাদকর্মী যখন অন্যায় ও স্বার্থান্বেষীদের বিরুদ্ধে কলম ধরেন, তখন ষড়যন্ত্রকারীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে থেমে যাওয়া মানেই পরাজয়। সাহসিকতার সঙ্গে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেই আসে সাফল্য। এসব নানা সংকটের মধ্যেও সুনামকণ্ঠ’র সম্পাদক ও প্রকাশক বিজন সেন রায় কখনো বিচলিত হননি। বরং তিনি সবসময় সংবাদকর্মীদের সাহস জুগিয়ে যাচ্ছেন। স¤পাদকম-লীর সভাপতি মো. জিয়াউল হকের সঙ্গে বৈঠকে বারবারই বলা হয়েছে, ন্যায়ের পক্ষে থেকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সংগ্রহ অব্যাহত রাখতে হবে। এই সাহসী নেতৃত্বের কারণেই সংবাদকর্মীরা অনুসন্ধানী সংবাদ লেখায় উৎসাহিত হন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, চলতি বছরে সুনামগঞ্জ শহর ও শহরতলীর দুটি ঘটনায় সুনামকণ্ঠ’র বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের পর সুনামগঞ্জ, সিলেট ও ঢাকায় বিভিন্ন দপ্তরে পাঁচটি মিথ্যা অভিযোগ এবং সুনামগঞ্জ জজ আদালতে দুটি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। সংবাদগুলো লেখা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও সমাজ উন্নয়নের স্বার্থে। অথচ সেই ন্যায্য লেখার কারণেই প্রতিপক্ষরা আজ প্রকাশ্য শত্রুতে পরিণত হয়েছে। তবুও হাল ছাড়ার সুযোগ নেই। ক্ষুদ্রস্বার্থান্বেষী একটি গোষ্ঠী জেনে বুঝেই সাংবাদিকবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাবে, তা আমাদের জানা আছে। সংবাদ সংগ্রহ তুলনামূলক সহজ হলেও তথ্য যাচাই অত্যন্ত কঠিন। যাচাই করতে গেলেই অনেক সময় শত্রুতা তৈরি হয়, এ যেন অলিখিত নিয়ম। অথচ সংবাদ প্রকাশ রাষ্ট্র ও সমাজের মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। বাস্তবতা হলো, সেই সংবাদকর্মীরাই অনেক সময় অভিযুক্ত বা আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ান। যদি কোনো সাংবাদিক অপরাধীদের আড়াল করতে সংবাদ সংগ্রহে জড়ান, তবে সেই পেশায় না থাকাই শ্রেয়। এতে প্রকৃত সাংবাদিকরাই অপবাদে আক্রান্ত হন। এবার নিজের কথায় আসি। পত্রিকা পড়া থেকে শুরু করে প্রিন্টিং প্রেসে চাকরি, সেখান থেকেই সংবাদ লেখার প্রতি গভীর আকর্ষণ জন্ম নেয়। একবার সাংবাদিকতা মাথায় ঢুকে যাওয়ায় আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। অন্য পেশায় কয়েকবার চেষ্টা করেও কলম ছেড়ে থাকতে পারিনি। সম্মানের সঙ্গে সংবাদ লেখাই আমার পথ। বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন নয়, বরং সৎভাবে টিকে থাকাই আমার লক্ষ্য। অবৈধ পথে হাঁটা বা কলম থামিয়ে হাত পাতার কথা ভাবলেই তা হাস্যকর মনে হয়। পরিবার ও সমাজের কাছে হেয় হওয়ার ভয় থেকেই সৎ পথ আঁকড়ে আছি। যদিও ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসাব মেলানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। তবুও বলতে পারি, আমার সুখ-দুঃখের সাথী সহকর্মীরা এবং সমাজের সচেতন মানুষ। তাঁদের সহানুভূতি ও ভালোবাসা না থাকলে এই মহান পেশায় টিকে থাকা আরও কঠিন হতো। আমি সুনামকণ্ঠ’র সঙ্গে আছি শুরু থেকেই। কী পেলাম, সেটা মুখ্য নয়। পেয়েছি শ্রদ্ধা, ¯েœহ ও ভালোবাসা। সম্পাদক বিজন সেন রায় একজন ধৈর্যশীল, সৎ, শান্তিপ্রিয় ও মানুষপ্রেমী মানুষ। প্রতিদিন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পদচারণায় অফিস যেন হয়ে ওঠে আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগির এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। এই দৈনিক সুনামকণ্ঠ অফিসে প্রতিদিনই যেন এক প্রাণবন্ত জীবনের চলমান ছবি ভেসে ওঠে। মেঘ, বৃষ্টি, ঝড়, প্রচ- গরম কিংবা কনকনে শীত, কোনো কিছুই এখানে উপস্থিতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সুনামকণ্ঠ’র সুহৃদ অ্যাড. চাঁন মিয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. আসাদুল্লাহ সরকার, প্রফেসর সৈয়দ মহিবুল ইসলাম, সুখেন্দু সেন, বিকাশ রঞ্জন চৌধুরী ভানু, নৃপেশ তালুকদার নানু, মানিক দে, অরুণ চন্দ্র দে, কবি পুলিন রায়, বাহলুল বখত, মোরশেদ আলম, নির্মল ভট্টাচার্য্য, শামস শামীম, ইসমাইল হোসেন, এরশাদ মিয়া, আলী নুর, মানব তালুকদার, দেবল তালুকদার, প্রভাষক দুলাল মিয়া, শিক্ষক অনুপ তালুকদার, সুবল বিশ্বাস, সাজাউর রহমান, আহমেদ নুর আলবাব, সুরঞ্জিত গুপ্ত রঞ্জু, আলী হায়দার, আদিল আরমান, মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ আসকির, আমিনুল হক, শহীদনূর আহমেদ, তানভীর আহমেদ, বাবুল মিয়া, জালাল উদ্দিন নাসিম, আতাউর রহমানসহ আরও বহু প্রিয়জনের আনাগোনায় অফিসটি থাকে মুখর ও প্রাণচঞ্চল। গত কয়েক বছর আগেও শিক্ষাবিদ মু. আব্দুর রহীম, শিক্ষক আব্দু মিয়া, অ্যাড. স্বপন কুমার দে, প্রফেসর ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস, প্রফেসর দিলীপ কুমার মজুমদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, কবি ইকবাল কাগজী, কবি কুমার সৌরভ, কবি পুলিন রায়, কবি তোবারক আলী, কোহিনূর বেগম, লেখক ও গবেষক ফারহাত জাহান, প্রভাষক ইলিয়াস আলী, প্রভাষক শাহাদৎ হোসেন, সাজাউর রহমান, বাদলকৃষ্ণ দাসসহ অনেকেই আড্ডা জমিয়ে তোলতেন। ওই সময় পত্রিকার বার্তা সম্পাদক ছিলেন মো. শাহার উদ্দিন। তখন অফিসটি ছিল শহরের পৌর মার্কেটের দ্বিতীয় তলায়। বর্তমান অফিস শহরের মুক্তারপাড়ায় সকাল ও সন্ধ্যায় আড্ডা জমে উঠে। এই আড্ডার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রায়ই থাকেন ইসমাইল হোসেন। তাঁর কথার সূত্র ধরেই এরশাদ মিয়ার বিশ্লেষণ, আলোচনা ও সমালোচনার রেশ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। রঙ্গ-রস আর আন্তরিক কথোপকথনে কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, তা কেউই টের পান না। এভাবেই প্রতিদিন অফিস হয়ে ওঠে সরগরম ও জীবন্ত। আড্ডা শেষে প্রত্যেকে একটি করে পত্রিকা সঙ্গে নিয়ে ফেরেন। অবসর জীবনের সময়টুকু তাদের কাটে বেশ আনন্দেই। তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে। কোনো দিন যদি সম্পাদক বিজন সেন রায় অফিসে উপস্থিত না থাকেন, সেদিন যেন পুরো চিত্রটাই বদলে যায়। তখন আর তেমন কারো আগমন ঘটে না। অফিসজুড়ে নেমে আসে এক ধরনের নীরবতা, দীর্ঘ সময় কাটে নিস্তব্ধতা ও নিরিবিলিতে। সুনামকণ্ঠ প্রকাশনার সূচনালগ্ন থেকেই এই অফিস আড্ডার ধারাবাহিকতা আজও অটুট রয়েছে। সুনামকণ্ঠ’র স্টাফ রিপোর্টার ছাড়াও উপজেলা প্রতিনিধিরা ধারাবাহিক প্রকাশনা বজায় রাখতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই চারণ সংবাদকর্মীদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। দৈনিক সুনামকণ্ঠ’র গ্রাফিক্স ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মিল্লাত আহমেদ। সুনামকণ্ঠ’র দীর্ঘ পথচলায় তার অবদানও কম নয়। পত্রিকার ছাপার দায়িত্বে নিবেদিত প্রাণ আরিফুল ইসলাম সাকিব ও মোহাম্মদ ইয়াসিন। তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাছাড়া সাপোর্ট স্টাফ মোহাম্মদ ইয়াসিন আহমদও ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করছে। সুনামকণ্ঠ’র সার্কুলেশনের দায়িত্বে রয়েছেন সামায়ুন কবির। তিনি কখনো দায়িত্বে অবহেলা করেন না। আমাদের হকাররাও পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। এতো পরিশ্রমের মাঝেও সবার মুখেই হাসি থাকে। এ যেন মিলেমিশে কাজ করার অনন্ত আনন্দ। এতো আয়োজনের কেন্দ্রে রয়েছেন সুনামকণ্ঠ’র সম্পাদকম-লীর সভাপতি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. জিয়াউল হক। তাঁর প্রেরণা, উৎসাহ এবং আন্তরিক সমর্থন সুনামকণ্ঠকে পথ নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে চলার। আগামী দিনগুলোতেও সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা কামনা করে প্রিয় পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই দৈনিক সুনামকণ্ঠ’র এক যুগে পদার্পণের প্রাণঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
[আকরাম উদ্দিন : লেখক, সাংবাদিক, গল্পকার ও গবেষক]
[আকরাম উদ্দিন : লেখক, সাংবাদিক, গল্পকার ও গবেষক]