স্টাফ রিপোর্টার ::
সীমান্ত, সমতল ও হাওর নিয়ে বিস্তৃত সম্পদ ও সম্ভাবনাময় নির্বাচনী এলাকা সুনামগঞ্জ-১ তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগরসহ চারটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। কমরেড বরুণ রায়, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, নজির হোসেনসহ জাতীয় রাজনীতিবিদরা এখান থেকে সংসদ নির্বাচন করেছেন। তাই এই আসনটির প্রতি অন্য আসনের চেয়ে সবার আলাদা নজর থাকে। এবারও নানাভাবে আলোচনায় রয়েছে আসনটি। শেষ মুহূর্তে এসে রবিবার সন্ধ্যায় মনোনয়নবঞ্চিত ‘মেইড ইন ছাত্রদল’ খ্যাত জনপ্রিয় নেতা কামরুজ্জামান কামরুলকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এরপর আসনটি জুড়ে তৃণমূল বিএনপির উচ্ছ্বাস লক্ষ করা গেছে।
এই এলাকায় স্কুলজীবন থেকে ছাত্রদলের রাজনীতি করে মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছেন ২০১৮ সালে ভোটারদের খরচে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়া সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান কামরুল।
নেতাকর্মীরা জানান, গত দুই দশক ধরে মাটি কামড়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ঝা-া ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। মাঠে তার জনপ্রিয়তা ও দলের প্রতি আত্মত্যাগ, মামলা, হামলা ও নির্যাতনের কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়। এবারও জাতীয় নির্বাচনের আগে চারটি উপজেলায় বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নের দাবি তুলে তৃণমূল। কিন্তু গত ৩ নভেম্বর এই আসনে কামরুজ্জামান কামরুলের কাছে পরাজিত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনিসুল হককে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। এতে হতাশ হন চারটি উপজেলার তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তারা প্রার্থী পুনঃবিবেচনার দাবিতে এরপর থেকে মাঠে প্রতিদিন বিশাল শোডাউন করে প্রার্থী বদলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। পরে দলীয় মহাসচিব ঢাকায় কামরুলকে ডেকে নিয়ে মাঠে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না দেওয়ায় তৃণমূলের চাপে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল কামরুলের। এর আগেই ২৮ ডিসেম্বর রবিবার সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ-১ আসনে কামরুজ্জামান কামরুলকে দলীয় মনোনয়নে সংযুক্তি করে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়।
নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্কুল জীবনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের প্রতিবাদ করে একটি শক্তিশালী গোষ্ঠীকে প্রতিরোধের ডাক দিয়ে আলোচনায় আসেন কামরুল। এরপরে উপজেলা ছাত্রদল, জেলা ছাত্রদলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বর্তমানে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সক্রিয় রাজনীতি করার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রায় ১ বছর জেল খেটেছেন। এক ডজন মামলায় আসামি হয়েছেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি নির্বাচনে বর্জনের ঘোষণা দিয়ে রাজপথে লাঠি হাতে প্রতিরোধের মিছিল করেন। এ কারণে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে হুলিয়া জারি করেছিল। ৫ আগস্ট যখন অন্যান্য এলাকার কিছু নেতাকর্মী চাঁদাবাজি দখলে ব্যস্ত তখন জেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মবতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার বক্তব্য দিয়ে কামরুল প্রশংসিত হন। দলের প্রতি কামরুলের নিবেদন ও আত্মত্যাগের কারণেই দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা তার ভক্ত বনে যান বলে জানা গেছে। তারা যখনই তিনি সমাবেশ করেন নিজ খরচে সমাবেশের ব্যয় নির্বাহ করতে দেখা গেছে।
নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, রাজনীতির পাশাপাশি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে বিরাট ভূমিকা রাখেন কামরুল। নিজে নেতাকর্মী নিয়ে বাঁধ রক্ষায় মাটি কাটার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত করেন। বিশেষ করে নিজ আসনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক আলাদাভাবে বিবেচিত হয়। এভাবে দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান কামরুল।
এবারের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট সাংবাদিকরা সুনামগঞ্জ-১ আসনে নিজস্ব প্রতিনিধি পাঠিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। যেখানে কামরুলের জনপ্রিয়তা ও দলের প্রতি আত্মত্যাগের গল্প ওঠে আসে। মাঠের বিদ্যমান বাস্তবতা বিবেচনা করে এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে আসার পরই কামরুলকে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত হয় বলে জানা গেছে।
নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ১ মাস আগে এই আসনে আনিসুল হককে মনোনয়ন দিলেও দমে যাননি কামরুল। তিনি তৃণমূলের হাজার হাজার নেতাকর্মী নিয়ে মাঠে প্রচারণা চালিয়ে গেছেন। সবশেষে গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন নির্বাচনী এলাকার হাজারো নেতাকর্মী নিয়ে যোগ দেন। এভাবে হাল না ছেড়ে মাঠে পড়ে ছিলেন কামরুল।
তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদী হাসান উজ্জ্বল বলেন, চারটি উপজেলার বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের কান্না শুনেছে দলীয় হাইকমান্ড। কামরুল তৃণমূলের অপ্রতিরোধ্য শক্তি নিয়ে বেড়ে ওঠা এক নেতা। যাকে সাধারণ মানুষ ভালোবেসে নেতা বানিয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে যার আত্মার সম্পর্ক। অবশেষে দল যোগ্য মানুষটিকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ায় সবাই খুশি।
জামালগঞ্জ উপজেলা বিএনপি নেতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাজিব মাহমুদ তালুকদার বলেন, কামরুল সুনামগঞ্জ-১ আসনে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি ব্র্যান্ড। যাকে নিয়ে সবাই গর্ব করে। এই নেতাকে শেষ পর্যন্ত দল মনোনয়ন দেওয়ায় আমরা খুশি। এখন নেতাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে এই আসনকে জাতীয়তাবাদী শক্তির ঘাঁটি বানাতে চাই আমরা।
কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, আমার এলাকার সাধারণ মানুষ আমাকে নেতা বানিয়েছে। প্রতিটি কর্মী আমার ব্যাংক। যারা আমাকে অতীতের নির্বাচনে এবং বর্তমান নির্বাচনকালীন প্রচারণায় খরচ যোগাচ্ছে। আমার নেতা তারেক রহমান বলেছিলেন যারা দলে ত্যাগ স্বীকার করেছে, জেল-জুলুম সয়েছে তাদেরকে মূল্যায়ন করা হবে। আমার নেতা আমাকে মূল্যায়ন করেছেন। এখন এই আসন বিএনপিকে উপহার দেওয়াই আমার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। আমি আমার দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সহযোগিতা চাই।