অর্জন রায়::>
নদীমাতৃক বাংলাদেশ এক অপার সম্ভাবনার দেশ হওয়া সত্ত্বেও, এর উন্নয়নের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো প্রান্তিক বা গ্রামীণ পর্যায়ে শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা। ভূগোল, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক মনোভাব ও জলবায়ুগত সীমাবদ্ধতা এসব কিছু মিলিত হয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষাক্ষেত্রে এক জটিল ও বহুমুখী সংকট তৈরি করেছে। শিক্ষা যেখানে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অন্বেষণ এবং মানবিক মূল্যবোধের সংমিশ্রণ, সেখানে প্রান্তিক পর্যায়ে এর অভাব আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রাকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে। তবে সঠিক নীতি, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রতিবন্ধকতা থেকে পরিত্রাণ সম্ভব। একসময় তথ্যের অভাবে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটত। কিন্তু প্রযুক্তির এ যুগে এসেও যদি প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ শিক্ষায় অনগ্রসর থাকে, তবে এটি স্পষ্ট যে, শুধু প্রযুক্তির অভাব নয় বরং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যচ্যুত করছে। এই গভীর সংকট নিরসনে আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চল সরেজমিন পরিদর্শন করেছি এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার মূল কারণ ও তার সম্ভাব্য সমাধান অনুধাবনের চেষ্টা করেছি। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এমন লেখা।
প্রান্তিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা ও সমাধান : ১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অনুপস্থিতি : যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি ৭০-৮০ শতাংশ দেখানো হয়, বাস্তবিক পক্ষে বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার ৬০ শতাংশের নিচে এবং প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পর্যায়ক্রমিকভাবে অর্থাৎ অনিয়মিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসে। এই সমস্যার সমাধানে কাঠামোগত পর্যালোচনা প্রয়োজন।
১.১ পারিবারিক আর্থিক দীনতা : শিশুমনে দারিদ্র্যের কালো মেঘ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ পরিবারের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণ কিংবা দিনমজুরি। এ থেকে উপার্জিত অর্থ নিতান্তই অপ্রতুল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এসব পরিবারের শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ প্রায়ই সীমিত হয়ে পড়ে। কৈশোরের ঊষালগ্নেই তাদের কেউ কৃষি শ্রমে যুক্ত হয়, কেউ বা বেঁচে থাকার তাগিদে শিশুশ্রমের কঠিন বাস্তবতায় নিবিষ্ট হতে বাধ্য হয়। ফলে তাদের দৃষ্টিতে বিদ্যালয়ে গমনের জন্য কোনো যৌক্তিক প্রেরণা অবশিষ্ট থাকে না। দারিদ্র্যের কষাঘাতে অনেক শিশু, শিশুশ্রমে নিযুক্ত হওয়ার ফলে তাদের শিক্ষার প্রতি বিমুখতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু শিক্ষার অভাবই আবার তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ করে ফেলে এ যেন এক অদ্ভুত প্যারাডক্স তথা কূটাভ্যাস। অন্যদিকে যারা সরাসরি শিশুশ্রমে যুক্ত হয় না, তারাও দারিদ্র্যের কঠোর কষাঘাতে চরম মানসিক চাপে থাকে। এ কারণেই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলেও তারা শিক্ষার প্রকৃত সুফল আত্মস্থ করতে পারে না, বরং দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা তাদের শিক্ষাজীবনকে ক্রমে আরও দুরূহ করে তোলে।
১.২ অভিভাবকদের অসচেতনতা ও পুষ্টিহীনতা : একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, দেশের বহু প্রান্তিক অঞ্চলে প্রায় ২০-৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়। তা ছাড়া একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর মা-বাবা কাজের সন্ধানে দেশ-বিদেশে পাড়ি জমান, যার ফলে শিশুরা পারিবারিক তত্ত্বাবধান থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রতিকূল পরিবেশ শিশুদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে তোলে এবং পরিশেষে তারা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে। শিশু যেন স্কুলকে একটি মানসিক আশ্রয় মনে করে, তার নিমিত্তে শিক্ষকদের প্রত্যাশিত গভীর মমতায় সেই মা-বাবা-ছাড়া সন্তানদের আগলে রাখা প্রয়োজন। আর্থিক দরিদ্রতার অনিবার্য ধারাপাতে শিশুদের পুষ্টিহীনতা একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। তাদের খাদ্যাভ্যাস একপেশে ও অসম্পূর্ণ, যেখানে ভাত ও আলুকেন্দ্রিক খাবারই মূল। এ খাদ্যতালিকা শুধু শর্করার চাহিদা পূরণ করলেও প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থেকে যায়। দারিদ্র্যের কারণে মাছ-মাংসের সংস্থান যেমন কঠিন, তেমনি শাকসবজি গ্রহণের প্রতি অনীহাও তাদের পুষ্টিগত ভারসাম্যহীনতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্বাস্থ্য খাতে সুস্পষ্ট। রোগবালাই যেন শিশুদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। পুষ্টিহীনতার ফলে তাদের দেহ রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা হারাতে থাকে, ফলে নানান শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতা তাদের ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
১.৩ মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি এবং সমাধান : সমস্যাগুলোর একটি কার্যকর ও সমন্বিত সমাধান হতে পারে দেশব্যাপী ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি চালু করা। এটি বাস্তবায়িত হলে তা প্রান্তিক শিক্ষার জন্য একটি ‘এধসব-ঈযধহমরহম ঝঃৎধঃবমু’ হিসেবে কাজ করবে। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি বৃদ্ধি : পুষ্টিকর খাবারের আকর্ষণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসবে এবং ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
শিক্ষায় মনোযোগ বৃদ্ধি : পুষ্টিকর খাবার (যেমন : ডিম, দুধ, কলা ও শাকসবজি) মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করে, যা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
২. উপবৃত্তির কার্যহীনতা ও বিকল্প ভাবনা বর্তমানে প্রদত্ত উপবৃত্তির অর্থ প্রায়ই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসামগ্রী ক্রয়ের পরিবর্তে পারিবারিক কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এই সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে : বিদ্যালয়ে ভর্তুকি মূল্যে ‘স্টেশনারি শপ’ : প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি ‘স্টেশনারি শপ’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নামমাত্র মূল্যে বা ৫০% ছাড়ে শিক্ষাসামগ্রী কিনতে পারবে। এই উদ্যোগটি স্কুলে উপস্থিতি বাড়াবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের একটি সহজ ও সুবিধাজনক উপায় হবে।
৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মানসিক প্রস্তুতি : শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ বিশেষ কাজের প্রস্তুতি আর অভিজ্ঞতা এ দুয়ের সমন্বয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন না। এর মূল কারণ, শিক্ষকতা পেশার জন্য তাদের মানসিক প্রস্তুতির অভাব। দেশের প্রেক্ষাপটে, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় ৮০% শিক্ষকের কাছে শিক্ষকতা শেষ অবলম্বন হিসেবে বেছে নেওয়া একটি পেশা। ফলে তারা মানসিকভাবে এই পেশার সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন না, যা তাদের পাঠদান ও প্রশিক্ষণেও প্রতিফলিত হয়। তত্ত্ব ও বাস্তবতার সমন্বয় : কোর্সে শিশু মনস্তত্ত্ব, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি ও যোগাযোগ দক্ষতার মতো বিষয়গুলো শেখানো হবে। স্নাতক পর্যায়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ২-৬ মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা থাকবে, যা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করবে।
নিয়োগে অগ্রাধিকার : ‘প্রাথমিক শিক্ষায় স্নাতক’ ডিগ্রিধারীদের সরকারি শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হলে, মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হবে এবং শিক্ষার মান উন্নত হবে।
৫. প্রাথমিক শিক্ষকতা পেশা নিয়ে নতুন ভাবনা :
৫.১ নিয়োগে কোটা সংস্কার ও পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়ন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে কোটা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা জরুরি। শিক্ষাদান একটি বৈচিত্র্যময় ও সৃষ্টিশীল কাজ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যোগ্য ও মেধাবীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। পাঠদান পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা আবশ্যক। শিক্ষাকে তথ্য মুখস্থনির্ভর না করে শিশুমনের কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশক্তি বিকাশের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে যখন উপলব্ধি (ঈড়সঢ়ৎবযবহংরড়হ) ও বাস্তবিক সমস্যা সমাধানই (চৎধমসধঃরপ চৎড়নষবস ঝড়ষারহম) মূল দক্ষতা, তখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেভাবে ঢেলে সাজাতে হবে।
৫.২ শিক্ষকদের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি : শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। লাঞ্চ ভাতা বৃদ্ধি, আর্থিক প্রণোদনা, যৌক্তিক পদোন্নতি কাঠামো (যেমন : সহকারী শিক্ষক, সিনিয়র সহকারী শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক) এবং প্রশাসনিক কাজ থেকে শিক্ষকদের মুক্ত রেখে পাঠদানে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন অফিস সহকারী নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষকরা পাঠদানে আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।
৬. ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা : বাংলাদেশের হাওর, চরাঞ্চল, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকার মতো দুর্গম অঞ্চলগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষত বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ঝরে পড়ার হার কমেছে (বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ২০২৩ অনুযায়ী ১০.৬৩ শতাংশ), তবুও দুর্গম অঞ্চলে এই হার এখনো অনেক বেশি। কৃষিনির্ভর ছুটির সমন্বয় : ধান কাটা বা স্থানীয় ফসল তোলার মৌসুমে প্রান্তিক অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি বেড়ে যায়। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জন্য বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকা বা পাঠদানের সময় সমন্বয় করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক জীবন ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো, একটি সুশিক্ষিত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। প্রান্তিক অঞ্চলে শিক্ষার বহুমুখী সংকট সমাধানে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, উপবৃত্তির কার্যকর বিকল্প তৈরি, শিক্ষকদের জন্য বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন এসব পদক্ষেপের সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। এর মাধ্যমে আমরা গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি। বাস্তবতাবিবর্জিত কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না, তাই মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণ করলে তবেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বৈশি^ক মানে পৌঁছতে সক্ষম হবে।
(সংক্ষেপিত)
[অর্জন রায় : প্রকৌশলী ও কলাম লেখক]
নদীমাতৃক বাংলাদেশ এক অপার সম্ভাবনার দেশ হওয়া সত্ত্বেও, এর উন্নয়নের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো প্রান্তিক বা গ্রামীণ পর্যায়ে শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা। ভূগোল, অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক মনোভাব ও জলবায়ুগত সীমাবদ্ধতা এসব কিছু মিলিত হয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষাক্ষেত্রে এক জটিল ও বহুমুখী সংকট তৈরি করেছে। শিক্ষা যেখানে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অন্বেষণ এবং মানবিক মূল্যবোধের সংমিশ্রণ, সেখানে প্রান্তিক পর্যায়ে এর অভাব আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রাকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে। তবে সঠিক নীতি, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রতিবন্ধকতা থেকে পরিত্রাণ সম্ভব। একসময় তথ্যের অভাবে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটত। কিন্তু প্রযুক্তির এ যুগে এসেও যদি প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ শিক্ষায় অনগ্রসর থাকে, তবে এটি স্পষ্ট যে, শুধু প্রযুক্তির অভাব নয় বরং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যচ্যুত করছে। এই গভীর সংকট নিরসনে আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চল সরেজমিন পরিদর্শন করেছি এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার মূল কারণ ও তার সম্ভাব্য সমাধান অনুধাবনের চেষ্টা করেছি। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এমন লেখা।
প্রান্তিক শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা ও সমাধান : ১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অনুপস্থিতি : যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি ৭০-৮০ শতাংশ দেখানো হয়, বাস্তবিক পক্ষে বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার ৬০ শতাংশের নিচে এবং প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পর্যায়ক্রমিকভাবে অর্থাৎ অনিয়মিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসে। এই সমস্যার সমাধানে কাঠামোগত পর্যালোচনা প্রয়োজন।
১.১ পারিবারিক আর্থিক দীনতা : শিশুমনে দারিদ্র্যের কালো মেঘ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ পরিবারের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণ কিংবা দিনমজুরি। এ থেকে উপার্জিত অর্থ নিতান্তই অপ্রতুল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এসব পরিবারের শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ প্রায়ই সীমিত হয়ে পড়ে। কৈশোরের ঊষালগ্নেই তাদের কেউ কৃষি শ্রমে যুক্ত হয়, কেউ বা বেঁচে থাকার তাগিদে শিশুশ্রমের কঠিন বাস্তবতায় নিবিষ্ট হতে বাধ্য হয়। ফলে তাদের দৃষ্টিতে বিদ্যালয়ে গমনের জন্য কোনো যৌক্তিক প্রেরণা অবশিষ্ট থাকে না। দারিদ্র্যের কষাঘাতে অনেক শিশু, শিশুশ্রমে নিযুক্ত হওয়ার ফলে তাদের শিক্ষার প্রতি বিমুখতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু শিক্ষার অভাবই আবার তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ করে ফেলে এ যেন এক অদ্ভুত প্যারাডক্স তথা কূটাভ্যাস। অন্যদিকে যারা সরাসরি শিশুশ্রমে যুক্ত হয় না, তারাও দারিদ্র্যের কঠোর কষাঘাতে চরম মানসিক চাপে থাকে। এ কারণেই বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলেও তারা শিক্ষার প্রকৃত সুফল আত্মস্থ করতে পারে না, বরং দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা তাদের শিক্ষাজীবনকে ক্রমে আরও দুরূহ করে তোলে।
১.২ অভিভাবকদের অসচেতনতা ও পুষ্টিহীনতা : একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, দেশের বহু প্রান্তিক অঞ্চলে প্রায় ২০-৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়। তা ছাড়া একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর মা-বাবা কাজের সন্ধানে দেশ-বিদেশে পাড়ি জমান, যার ফলে শিশুরা পারিবারিক তত্ত্বাবধান থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রতিকূল পরিবেশ শিশুদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে তোলে এবং পরিশেষে তারা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে। শিশু যেন স্কুলকে একটি মানসিক আশ্রয় মনে করে, তার নিমিত্তে শিক্ষকদের প্রত্যাশিত গভীর মমতায় সেই মা-বাবা-ছাড়া সন্তানদের আগলে রাখা প্রয়োজন। আর্থিক দরিদ্রতার অনিবার্য ধারাপাতে শিশুদের পুষ্টিহীনতা একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। তাদের খাদ্যাভ্যাস একপেশে ও অসম্পূর্ণ, যেখানে ভাত ও আলুকেন্দ্রিক খাবারই মূল। এ খাদ্যতালিকা শুধু শর্করার চাহিদা পূরণ করলেও প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থেকে যায়। দারিদ্র্যের কারণে মাছ-মাংসের সংস্থান যেমন কঠিন, তেমনি শাকসবজি গ্রহণের প্রতি অনীহাও তাদের পুষ্টিগত ভারসাম্যহীনতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব স্বাস্থ্য খাতে সুস্পষ্ট। রোগবালাই যেন শিশুদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। পুষ্টিহীনতার ফলে তাদের দেহ রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা হারাতে থাকে, ফলে নানান শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতা তাদের ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
১.৩ মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি এবং সমাধান : সমস্যাগুলোর একটি কার্যকর ও সমন্বিত সমাধান হতে পারে দেশব্যাপী ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি চালু করা। এটি বাস্তবায়িত হলে তা প্রান্তিক শিক্ষার জন্য একটি ‘এধসব-ঈযধহমরহম ঝঃৎধঃবমু’ হিসেবে কাজ করবে। শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি বৃদ্ধি : পুষ্টিকর খাবারের আকর্ষণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসবে এবং ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
শিক্ষায় মনোযোগ বৃদ্ধি : পুষ্টিকর খাবার (যেমন : ডিম, দুধ, কলা ও শাকসবজি) মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করে, যা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
২. উপবৃত্তির কার্যহীনতা ও বিকল্প ভাবনা বর্তমানে প্রদত্ত উপবৃত্তির অর্থ প্রায়ই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসামগ্রী ক্রয়ের পরিবর্তে পারিবারিক কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এই সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে : বিদ্যালয়ে ভর্তুকি মূল্যে ‘স্টেশনারি শপ’ : প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি ‘স্টেশনারি শপ’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নামমাত্র মূল্যে বা ৫০% ছাড়ে শিক্ষাসামগ্রী কিনতে পারবে। এই উদ্যোগটি স্কুলে উপস্থিতি বাড়াবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের একটি সহজ ও সুবিধাজনক উপায় হবে।
৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মানসিক প্রস্তুতি : শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ বিশেষ কাজের প্রস্তুতি আর অভিজ্ঞতা এ দুয়ের সমন্বয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে পারছেন না। এর মূল কারণ, শিক্ষকতা পেশার জন্য তাদের মানসিক প্রস্তুতির অভাব। দেশের প্রেক্ষাপটে, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় ৮০% শিক্ষকের কাছে শিক্ষকতা শেষ অবলম্বন হিসেবে বেছে নেওয়া একটি পেশা। ফলে তারা মানসিকভাবে এই পেশার সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন না, যা তাদের পাঠদান ও প্রশিক্ষণেও প্রতিফলিত হয়। তত্ত্ব ও বাস্তবতার সমন্বয় : কোর্সে শিশু মনস্তত্ত্ব, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি ও যোগাযোগ দক্ষতার মতো বিষয়গুলো শেখানো হবে। স্নাতক পর্যায়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ২-৬ মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা থাকবে, যা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করবে।
নিয়োগে অগ্রাধিকার : ‘প্রাথমিক শিক্ষায় স্নাতক’ ডিগ্রিধারীদের সরকারি শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হলে, মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হবে এবং শিক্ষার মান উন্নত হবে।
৫. প্রাথমিক শিক্ষকতা পেশা নিয়ে নতুন ভাবনা :
৫.১ নিয়োগে কোটা সংস্কার ও পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়ন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে কোটা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা জরুরি। শিক্ষাদান একটি বৈচিত্র্যময় ও সৃষ্টিশীল কাজ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যোগ্য ও মেধাবীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। পাঠদান পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা আবশ্যক। শিক্ষাকে তথ্য মুখস্থনির্ভর না করে শিশুমনের কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশক্তি বিকাশের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে যখন উপলব্ধি (ঈড়সঢ়ৎবযবহংরড়হ) ও বাস্তবিক সমস্যা সমাধানই (চৎধমসধঃরপ চৎড়নষবস ঝড়ষারহম) মূল দক্ষতা, তখন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেভাবে ঢেলে সাজাতে হবে।
৫.২ শিক্ষকদের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি : শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। লাঞ্চ ভাতা বৃদ্ধি, আর্থিক প্রণোদনা, যৌক্তিক পদোন্নতি কাঠামো (যেমন : সহকারী শিক্ষক, সিনিয়র সহকারী শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক) এবং প্রশাসনিক কাজ থেকে শিক্ষকদের মুক্ত রেখে পাঠদানে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন অফিস সহকারী নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষকরা পাঠদানে আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।
৬. ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা : বাংলাদেশের হাওর, চরাঞ্চল, পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকার মতো দুর্গম অঞ্চলগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষত বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ঝরে পড়ার হার কমেছে (বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ২০২৩ অনুযায়ী ১০.৬৩ শতাংশ), তবুও দুর্গম অঞ্চলে এই হার এখনো অনেক বেশি। কৃষিনির্ভর ছুটির সমন্বয় : ধান কাটা বা স্থানীয় ফসল তোলার মৌসুমে প্রান্তিক অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি বেড়ে যায়। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জন্য বিদ্যালয়ের ছুটির তালিকা বা পাঠদানের সময় সমন্বয় করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক জীবন ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো, একটি সুশিক্ষিত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। প্রান্তিক অঞ্চলে শিক্ষার বহুমুখী সংকট সমাধানে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, উপবৃত্তির কার্যকর বিকল্প তৈরি, শিক্ষকদের জন্য বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন এসব পদক্ষেপের সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। এর মাধ্যমে আমরা গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি। বাস্তবতাবিবর্জিত কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না, তাই মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণ করলে তবেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বৈশি^ক মানে পৌঁছতে সক্ষম হবে।
(সংক্ষেপিত)
[অর্জন রায় : প্রকৌশলী ও কলাম লেখক]