দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা, মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারার জন্য সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট এবং উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মতো প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কেবল কয়েকটি ভবনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা নয়, এটি রাষ্ট্রের বিবেক, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার ওপর সরাসরি আঘাত।
সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কোনো সশস্ত্র শক্তিও নয়। তারা সমাজের আয়না, রাষ্ট্রের নৈতিক কম্পাস। অথচ সেসব প্রতিষ্ঠানে ঘোষণা দিয়েই হামলা চালানো হয়, অগ্নিসংযোগ করা হয়, লুটপাট হয় - এবং ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পরও জড়িত কাউকে শনাক্ত করা যায় না। এটি নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং ভয়ংকর এক শূন্যতার ইঙ্গিত।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ইতিহাসে প্রথমবার প্রকাশনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় - এ ঘটনা শুধু গণমাধ্যমের নয়, গোটা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। ছায়ানট ও উদীচীর ওপর হামলা প্রমাণ করে, মুক্ত সংস্কৃতি ও প্রগতিশীল চিন্তা এখনও একটি সংঘবদ্ধ অন্ধশক্তির প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
প্রশ্ন উঠছে- এই হামলাগুলো কি হঠাৎ? নাকি পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? যদি হুমকির কথা আগেই জানা থাকে, তবে কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি? কেন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? এসব প্রশ্নের জবাব শুধু পুলিশ বা প্রশাসনের নয়, সরকারেরও।
গণমাধ্যমের কাজ সত্য তুলে ধরা, প্রশ্ন করা, অনিয়ম দেখানো। আর সংস্কৃতির কাজ মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত রাখা। এই দুই স্তম্ভকে আতঙ্কিত করে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মানেই সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া। ইতিহাস সাক্ষী, যে রাষ্ট্রে সংবাদপত্র ও সংস্কৃতি নিরাপদ নয়, সেখানে নাগরিকের স্বাধীনতাও নিরাপদ থাকে না। এ অবস্থায় দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই পারে জনমনে আস্থা ফেরাতে। অন্যথায় এই নীরবতা ও ব্যর্থতা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ হামলার পথ প্রশস্ত করবে। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে- গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রের শত্রু নয়, রাষ্ট্রের শক্তি। এই শক্তিকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ, পুরো দেশ। এখনই সময় স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার, নতুবা ইতিহাস এই ব্যর্থতার দায় ক্ষমা করবে না।