মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী ::
সুনামগঞ্জের দিগন্তজোড়া দেখার হাওর। যেখানে কেবল বোরো ধানের একফসলি আবাদ আর বর্ষার অথৈ জলরাশিই ছিল চিরচেনা রূপ, সেখানে এখন উঁকি দিচ্ছে ভিন্ন এক সম্ভাবনা। হাওরের উর্বর পলিমাটিকে কাজে লাগিয়ে ফলেছে দেশীয় জাতের লাল টমেটো, বেগুন আর কাঁচা মরিচ। এই নীরব কৃষি বিপ্লবের কারিগর পলিরচর গ্রামের সাহসী কৃষাণী খাতুন, যার হাত ধরে পাল্টে যাচ্ছে হাওরপাড়ের সনাতনী কৃষির চিত্র।
বছরের একটি দীর্ঘ সময় যে জমিগুলো অনাবাদি পড়ে থাকত, সেই পরিত্যক্ত মাটিতেই আজ ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন খাতুন। প্রচলিত ধারণা ছিল- হাওর মানেই শুধু ধান। কিন্তু সেই প্রথা ভেঙে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেন দেশীয় জাতের টমেটো চাষ। খরচ কম, পরিচর্যা সহজ আর বাজারের চাহিদাও আকাশচুম্বী। প্রথম মৌসুমেই আশাতীত লাভের মুখ দেখেন তিনি।
কৃষাণী খাতুন বলেন, হাওরের মাটিতে শুধু ধান হবে - এই ধারণা আমরা ভুল প্রমাণ করেছি। এখানকার পলিমাটি সবজি চাষের জন্য আশীর্বাদ। দেশীয় ফসলে রোগবালাই যেমন কম হয়, তেমনি উৎপাদন খরচও সাধারণের নাগালের মধ্যে থাকে।
খাতুনের এই নীরব সাফল্য এখন ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম থেকে গ্রামে। তার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে একই গ্রামের নুর উদ্দিনের মতো সাধারণ কৃষকরাও এখন সবজি চাষে ঝুঁকছেন। এক সময় অভাবের সাথে লড়াই করা নুর উদ্দিন এখন নিজের জমিতে টমেটো, বেগুন আর কপির সমারোহ ঘটিয়েছেন।
কৃষক নুর উদ্দিন বলেন, আমি এখন নিজের জমির সবজি বিক্রি করেই স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চালাচ্ছি। বাজারে দেশীয় বিষমুক্ত সবজির আলাদা কদর আছে, দামও ভালো পাওয়া যায়।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, বর্ষার শেষে নদী ও হাওর থেকে আসা পলি জমিকে প্রাকৃতিকভাবেই উর্বর করে তোলে। এই মাটি সবজি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে যদি হাওরাঞ্চলে সবজি চাষ সম্প্রসারণ করা যায়, তবে এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেখার হাওরের এই সাফল্য অন্যান্য কৃষকদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ। ধান চাষের পাশাপাশি এই বিকল্প আয়ের পথ কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা পেলে হাওরাঞ্চল হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান সবজি ভান্ডার।
পলিরচর গ্রামের এই দুই স্বপ্নবাজ মানুষের লড়াই যেন মাটির বুকে সমৃদ্ধির এক নতুন ‘স্বপ্নলিপি’। তাদের এই সাহসী উদ্যোগ প্রমাণ করছে- সঠিক পরিকল্পনা ও শ্রমের সমন্বয় ঘটলে প্রতিকূল হাওর অঞ্চলও হয়ে উঠতে পারে অপার সম্ভাবনার এক সবুজ প্রান্তর।