মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে ধরে রাখতে হবে

আপলোড সময় : ১৬-১২-২০২৫ ০৯:৫৭:৩৬ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৬-১২-২০২৫ ০৯:৫৭:৩৬ পূর্বাহ্ন
আজ ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল, অহংকারের দিন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর এই দিনেই পরাজিত হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। এই বিজয় কোনো একক শ্রেণি বা গোষ্ঠীর নয়; এটি ছিল এ দেশের আপামর জনতার সম্মিলিত ত্যাগ, সংগ্রাম ও অদম্য সাহসের ফসল। মহান বিজয় দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি ত্রিশ লাখ শহীদকে, সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের এবং সেইসব অজানা বীরদের - যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন ভূখন্ড-। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল নয়। এটি অর্জিত হয়েছে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শুধু স্বাধীনতা দেয়নি; দিয়েছে ভাষার অধিকার, আত্মমর্যাদা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং নিজস্ব পরিচয়। অথচ বিজয়ের এই দিনে দাঁড়িয়েও আমাদের স্বীকার করতে হয়- মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ও চেতনা আজ নানা সংকটে আক্রান্ত। বর্তমানে দেশের বাস্তবতায় আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার অপচেষ্টা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, যুদ্ধাপরাধীদের ঘিরে সহানুভূতির ভাষ্য শোনা যাচ্ছে, আর ‘বিকল্প ইতিহাস’-এর নামে একাত্তরের সত্যকে ধূসর করার প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, শহীদদের সংখ্যা নিয়ে কটাক্ষ কিংবা স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা -এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গভীর সংকেত। মুক্তিযুদ্ধ ছিল শোষণ, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে একটি সার্বজনিক বিদ্রোহ। এর মূল চেতনা ছিল গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে যখন সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও মানবিক অবক্ষয়ের চিত্র সামনে আসে, তখন প্রশ্ন জাগে- আমরা কি সত্যিই একাত্তরের চেতনাকে ধারণ করতে পেরেছি? যদি মুক্তিযুদ্ধ কেবল আনুষ্ঠানিক দিবস পালন, ফুলের তোড়া আর বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শহীদদের রক্তের সঙ্গে নির্মম অবিচার হবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আদর্শ নিয়ে যে উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে, তা গভীরভাবে ভাবনার বিষয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় মুক্তিযুদ্ধকে কেবল তথ্য নয়, চেতনা হিসেবে উপস্থাপন করতে না পারলে ইতিহাস বিকৃতির পথ আরও প্রশস্ত হবে। কারণ ইতিহাস ভুলে গেলে বা ভুলভাবে জানলে জাতি সহজেই পথভ্রষ্ট হয়। আজ বিজয় দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- এই স্বাধীনতা চিরস্থায়ী নয়, একে প্রতিদিন রক্ষা করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধকে অবজ্ঞা করা মানে শুধু অতীতকে অস্বীকার করা নয়, এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকেও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া। যে জাতি নিজের শহীদদের সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়, সে জাতি দীর্ঘদিন সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে পারে না। তাই মহান বিজয় দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত- শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেব না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মূল্যবোধ ও আদর্শ রক্ষা করব সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধ থেকে। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক - সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই একাত্তরের চেতনাকে জীবন্ত রাখতে হবে শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে। একাত্তর আমাদের অতীত নয়, একাত্তর আমাদের চলমান প্রেরণা। মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ধরে রাখতে হলে চেতনায়, মননে ও কর্মে একাত্তরকে ধারণ করতেই হবে। এই বিজয় দিবসে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এটাই হোক আমাদের জাতির দৃঢ় প্রত্যয়।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com