তাহিরপুরের শহীদ সিরাজ লেক - যা নিলাদ্রী লেক নামেও পরিচিত। এটি শুধু পর্যটনস্পট নয়, এটি সুনামগঞ্জের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। মেঘালয় পাহাড়ের কোলে বিসিআইসি’র জায়গায় গড়ে ওঠা এই লেক বহু বছর ধরে সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রকৃতির অপার রূপমাধুর্যে ভরপুর এই লেককে ‘বাংলার কাশ্মীর’ বলা হয় অকারণে নয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে লেকের সৌন্দর্য ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
লেকের পশ্চিম পাড়জুড়ে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা একের পর এক অবৈধ দোকানকোঠা এখন লেকটির স্বাভাবিক রূপকে বিকৃত করছে। যেসব ব্যক্তি আগে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তারা এখন স্থায়ী দোকান তুলে লেকের পাড় দখলে নিচ্ছেন। এতে যেমন জায়গাটির নান্দনিকতা নষ্ট হচ্ছে, তেমনই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন শিল্পের বিকাশ।
প্রকৃতি ও নীরব সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত শহীদ সিরাজ লেকের ঠিক পাড় ঘেঁষে স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে লেকের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যপট নষ্ট হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের অভিযোগ- এই দখলবাজি চলতে থাকলে খুব শিগগিরই পর্যটকদের আগ্রহে ভাটা পড়বে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন সম্ভাবনার জন্য বড় ক্ষতির কারণ হবে।
এর আগেও লেক এলাকায় নির্মিত ‘ইত্যাদি’ লেখা তোরণ জনমতের চাপে প্রশাসন সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে গড়ে ওঠা দোকানগুলোর বিষয়ে এখনও তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি - এ অভিযোগ নতুন নয়। যদিও স্থানীয় প্রশাসন এবার দখল উচ্ছেদের আশ্বাস দিয়েছে, তবুও অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জনগণ সন্দিহান।
২৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির পিএসসি ও তাহিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুখ আলম শান্তনুর বক্তব্য আশাবাদী হলেও এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ। আজ-কালের মধ্যে উচ্ছেদের ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে, নইলে এ সুন্দর লেকটি আরেকটি দখলবাজির শিকার জায়গায় পরিণত হতে সময় লাগবে না।
শহীদ সিরাজ লেককে রক্ষার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ- প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিজিবি, পুলিশ ও সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণ। অবৈধ দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে কেউ লেকের পাড়ে স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে তুলতে না পারে, সে জন্য কঠোর নজরদারি ও নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
শহীদ সিরাজ লেক আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য - এটি রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। প্রশাসনের প্রতি আমাদের দৃঢ় আহ্বান, দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন এবং লেককে তার স্বাভাবিক রূপে ফিরিয়ে আনুন। আজ যদি কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, কাল হয়তো এই অপার সৌন্দর্যের লেকটি কেবলই স্মৃতি হয়ে যাবে - যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।