সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি - পাখিহীন হয়ে পড়ছে টাঙ্গুয়ার হাওরসহ জেলার বিভিন্ন হাওর-বিল। একসময় যে টাঙ্গুয়ার হাওর পরিযায়ী পাখির স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল, আজ সেখানে কোনো মতে দেখা মেলে অল্পকিছু পাখির। অথচ এই হাওরই ছিল শীত এলে হাজার মাইল দূর থেকে পাখিদের প্রাণের আশ্রয়। সেই জৌলুস আর নেই। নেই ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি ভেসে বেড়ানোর সেই দিনগুলোও।
পরিবেশ সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত দশ বছরে হাওরে পাখির সংখ্যা কমেছে প্রায় ৮৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে যেখানে ছিল প্রায় দুই লাখ পরিযায়ী পাখি, সেখানে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৩ হাজারে - গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। এই ভয়াবহ পতনের প্রধান কারণ পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য, হাওরের গাছপালা নিধন এবং পাখির স্বাভাবিক আবাসস্থলে মানুষের অবাধ অনুপ্রবেশ।
সাম্প্রতিক সময়ে বারোঘর, সাদরা বিলসহ বিভিন্ন হাওরে সরেজমিনে দেখা গেছে বড় আকারের সুতোর ফাঁদ, জাল ও বিভিন্ন যন্ত্র বসিয়ে রাতের অন্ধকারে পাখি ধরা হচ্ছে। এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্করাও এ শিকারকার্যে যুক্ত হচ্ছে; যা আরও উদ্বেগজনক। প্রশাসনের মাঝে মাঝে অভিযান ও পাখি উদ্ধার কার্যক্রম প্রশংসনীয় হলেও তা যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন হলো- হাওরের জীববৈচিত্র্য কি এভাবেই হারিয়ে যাবে? এভাবেই কি শূন্য হয়ে পড়বে পরিযায়ী পাখির প্রাকৃতিক আশ্রয়? আইনের কাঠামো আছে, প্রয়োগ কোথায়?
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পাখি শিকার দ-নীয় অপরাধ। তবুও হাওরে প্রতিনিয়তই হচ্ছে নির্বিচারে শিকার। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিয়মিত তৎপরতার অভাব ও স্থানীয় পর্যায়ে শিকারিদের প্রভাব-প্রতিপত্তিই মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা মনে করি, শীত মৌসুমে বিশেষ নজরদারি দল গঠন হাওরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোবাইল টহল ও রাতের অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি শিকারি ও গাছনিধনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া হাওর এলাকায় স্থায়ী পাখির আবাসস্থল পুনর্গঠন বনের ঝোপঝাড়, বাবুই গাছ, ডুবন্ত বনাঞ্চল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার জরুরি। একই সাথে পর্যটকদের অবাধ বিচরণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্কুল-কলেজ, স্থানীয় জেলে ও কৃষকদের নিয়ে সচেতনতা ক্যাম্পেইন বাড়াতে হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু সুনামগঞ্জের সম্পদ নয়, এটি দেশের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রামসার সাইট। এই হাওর হারালে আমরা হারাবো প্রাকৃতিক ভারসাম্য, হারাবো আন্তর্জাতিক পরিচিতিও। এক সময় এই হাওরে দেখা যেত মেটে রাজহাঁস, সরালি, পাটারি হাঁস, ধুপনি বকসহ অসংখ্য প্রজাতি। কিন্তু আজ সেসব স্মৃতি হয়ে উঠছে দূর অতীত। সুতরাং পাখি রক্ষায় এখনই কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় পাখিশূন্য হাওর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু গল্প শুনিয়েই যেতে হবে। সুনামগঞ্জের হাওর বাঁচাতে উদ্যোগ এখনই নিন।