দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন

আইএলটিএসে ‘ফেল’ করেও যুক্তরাজ্যে হাজারো মানুষের অভিবাসন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় বাংলাদেশসহ ৩ দেশে

আপলোড সময় : ০৯-১২-২০২৫ ০২:৫৮:০২ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৯-১২-২০২৫ ০২:৫৮:০২ অপরাহ্ন
সুনামকণ্ঠ ডেস্ক :: বাধ্যতামূলক ইংরেজি ভাষার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পরেও হাজার হাজার অভিবাসীকে ব্রিটিশ ভিসা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, এসব অভিবাসীর ভাষা সংক্রান্ত আইইএলটিএস পরীক্ষায় নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছিল এক চরম ভুল। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ সূত্র মারফত এই খবর জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিটিশ কাউন্সিলের নেওয়া ভাষা পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রায় ৮০ হাজার পরীক্ষার্থীর ফল ভুল এসেছিল। এর অর্থ হলো- তাদের মধ্যে অনেকেই ফেল করেও পাশ নম্বর পেয়ে গিয়েছিলেন। চীন, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামে এই ভাষা পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রতারণার প্রমাণও মিলেছে। সেখানে অপরাধীরা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে ফাঁস হওয়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি করে দেয়, যাতে তারা আগে থেকেই উত্তর জেনে যেতে পারে। ফলস্বরূপ, বিভিন্ন ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দেশটি জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে অনেক কর্মীই ইংরেজি ভাষায় দুর্বল দখল রাখার পরেও ভিসা পেয়েছেন। অথচ, এসব তাদের প্রাপ্য ছিল না। বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি এই ঘটনায় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, পরীক্ষা পাশ না করেই যারা ব্রিটেন গিয়েছে, তাদের যেন ‘দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়।’ প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্টিং সিস্টেম- আইইএলটিএস-এর পরীক্ষা দেন। ব্রিটিশ কাউন্সিল, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট এবং শিক্ষা সংস্থা আইডিপি যৌথভাবে এই পুরো ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ পরীক্ষার ভুল নম্বর পেয়েছেন। আইইএলটিএস এই ভুলের জন্য ‘একটি প্রযুক্তিগত সমস্যাকে’ দায়ী করেছে, যা ‘কিছু আইইএলটিএস অ্যাকাডেমিক ও জেনারেল ট্রেনিং পরীক্ষার লিসেনিং ও রিডিং-এর অংশবিশেষে প্রভাব ফেলেছিল।’ সংস্থাটি জানায়, মাত্র ১ শতাংশ পরীক্ষা এই ত্রুটির কারণে প্রভাবিত হয়েছিল। এই ত্রুটির কারণে প্রায় ৭৮ হাজার পরীক্ষার্থীর ফল ভুল হয়েছিল। সমস্যাটি ধরা পড়ে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। গত মাসে আইইএলটিএস ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সঠিক ফল জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা ‘আমাদের আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ ও উপযুক্ত সহায়তা দেওয়ার’ কথা বলেছে। জানা গেছে, কিছু পরীক্ষার্থীর নম্বর যা হওয়া উচিত ছিল, তার চেয়ে বেশি এসেছিল; আবার কারও কারও নম্বর এসেছিল কম। দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যাটি ধরা না পড়ায়, ভুলবশত যারা উত্তীর্ণ বলে গণ্য হয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ভিসা জোগাড় করে ‘বৈধভাবে’ ব্রিটেনে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেছেন। বিগত বছরগুলোতে ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন জানিয়েছিল, বিদেশি শিক্ষার্থীরা যেহেতু বেশি টিউশন ফি দেন, তাই কিছু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের দুর্বল ইংরেজি ভাষার দক্ষতা উপেক্ষা করছে। এমনকি কিছু প্রভাষক অভিযোগ করেছেন যে, প্রায় ৭০ শতাংশ বিদেশি ছাত্রের ইংরেজি ভাষার দখল যথেষ্ট নয়। এদিকে, এই ঘটনা ফাঁসের পর ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের করোনার বা তদন্তকারীরাও সতর্ক করেছেন, এনএইচএস ও সমাজসেবামূলক কাজে নিয়োজিত অনেকের ইংরেজি ভাষা জ্ঞান অপর্যাপ্ত, যা রোগীদের ঝুঁকিতে ফেলছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা ‘মারাত্মক’ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এক ঘটনায় একজন কেয়ার কর্মীর ইংরেজি পরীক্ষার কোনো রেকর্ড ছিল না। সেই কেয়ার কর্মী ৯৯৯ কল হ্যান্ডলারের সঙ্গে কথা বলার সময় ‘শ্বাস-প্রশ্বাস’ ‘নৎবধঃযরহম’ এবং ‘রক্তপাত’ ‘নষববফরহম’ কিংবা সতর্ক ‘ধষবৎঃ’ ও ‘জীবিত’ ‘ধষরাব’-এর মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেননি বলে একজন করোনার জানিয়েছিলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলিপ বলেছেন, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ১০ লাখ মানুষ আছেন যারা ভালোভাবে বা একেবারেই ইংরেজি বলতে পারেন না। আমাদের মধ্যে ইতিমধ্যেই সংহতির সংকট রয়েছে, আর এখন আমরা জানতে পারলাম যে ভিসা পাওয়ার আগে প্রায় ৭৮ হাজার মানুষ ভুল ফল পেয়ে থাকতে পারেন। যারা অন্যায্যভাবে ভিসা পেয়ে এসেছেন, তাদের সরিয়ে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, যদি মানুষ এখানে এসে কখনোই ইংরেজি না শেখে, তবে তারা সমাজের সঙ্গে মিশতে পারবে না এবং রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া স্বাধীন জীবন গড়তে পারবে না। এটা এক ভয়ংকর ব্যর্থতা। এ ছাড়া, আইইএলটিএস পরীক্ষায় প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। অপরাধীরা ঘুষ দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তা বিক্রি করছে। বাংলাদেশ পুলিশ দুজনকে আটক করেছে, যারা ১ হাজার পাউন্ড থেকে ২ হাজার ৫০০ পাউন্ডের বিনিময়ে ফাঁস হওয়া আইইএলটিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিক্রি করছিল। ভিয়েতনামে ব্রিটিশ কাউন্সিল গত ফেব্রুয়ারিতে একেবারে শেষ মুহূর্তে একটি নির্ধারিত পরীক্ষা বাতিল করে ‘ব্যাক-আপ’ সংস্করণে পরীক্ষা নিয়েছিল, যা প্রশ্ন ফাঁসের জল্পনা উসকে দেয়। সে সময় কাউন্সিল স্বীকার করেছিল যে, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র বিক্রির চেষ্টা বেড়ে গিয়েছিল। চীনেও প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে। ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় এখন বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে। ব্রিটিশ কাউন্সিল মূলত ইংরেজি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে নিজস্ব অর্থায়নে চলে। তবে পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে তারা কিছু অনুদানও পায়। কোভিডকালে সরকারি ঋণের কারণে তাদের ১৯ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ডের ঋণ রয়েছে, যা পরিশোধ করতে তারা হিমশিম খাচ্ছে। পরীক্ষার নম্বর-বিভ্রাট থেকে কোনো ক্ষতিপূরণের দাবি উঠলে তাদের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হবে। স্বরাষ্ট্র দপ্তর বর্তমানে ইংরেজি পরীক্ষা সরবরাহের জন্য ৮১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডের একটি নতুন পাঁচ বছরের চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই চুক্তির জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলকে অন্যান্য দরদাতা সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আইইএলটিএস-এর এক মুখপাত্র বলেছেন, আইইএলটিএস সম্প্রতি এমন একটি সমস্যা শনাক্ত করেছে, যার ফলে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী অল্পসংখ্যক পরীক্ষার্থী ভুল ফল পেয়েছিলেন। এই সময়ে নেওয়া আইইএলটিএস পরীক্ষার ৯৯ শতাংশের বেশি অপ্রভাবিত ছিল এবং বর্তমান আইইএলটিএস পরীক্ষাগুলোতে আর কোনো সমস্যা নেই। তিনি আরও বলেন, আমরা ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সঠিক ফল জানিয়েছি, আমাদের আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছি এবং উপযুক্ত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমরা সমস্ত সংশ্লিষ্ট অংশীদার ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি। প্রতি বছর আমরা লাখ লাখ আইইএলটিএস পরীক্ষা পরিচালনা করি এবং এর সততা বজায় রাখতে আমাদের কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া চালু আছে। এই সমস্যা যাতে আর না হয়, সে জন্য আমরা প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিয়েছি।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com