শিক্ষা বিস্তারে প্রয়োজন বাস্তবমুখী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

আপলোড সময় : ০৮-১২-২০২৫ ০৩:১৭:৩৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-১২-২০২৫ ০৩:১৭:৩৮ পূর্বাহ্ন
দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও প্রগতির পথরেখায় শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সম্প্রতি হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য বলছে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৪২ শতাংশেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা এখনো পঞ্চম শ্রেণীর নিচে। দীর্ঘ তিন দশকে সাক্ষরতা বৃদ্ধি, ঝরে পড়া কমানো এবং প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা মোট ১১টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও প্রত্যাশিত সাফল্য দৃশ্যমান হয়নি। প্রশ্ন উঠছে- এত প্রকল্প, এত অর্থ ব্যয়, তারপরও কেন দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো প্রাথমিক শিক্ষারও নিচে? শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পগুলো ছিল অনেকটাই দায়সারাভাবে নেয়া; প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত না করেই পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে। মনিটরিং ছিল দুর্বল, অনিয়ম ছিল প্রকট। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষাকে বিচ্ছিন্ন কোনো খাত হিসেবে দেখে প্রকল্প নেয়া হয়েছে, অথচ শিক্ষা কি শুধু বই-খাতা-স্কুল ভবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে পরিবারের দারিদ্র্য, সামাজিক পরিবেশ, শিক্ষকের দক্ষতা, বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং শেখার ফলাফল। যে দেশে ২৪ শতাংশ নারী কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি, যেখানে পাহাড়ি জেলার মতো এলাকায় নিরক্ষরতার হার ৩৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং যেখানে শিশুদের অনেকেই পরিবারকে সহযোগিতা করতে বাধ্য হয়ে শিক্ষাজীবন ছেড়ে দেয় - সেই দেশে কেবল পরিসংখ্যানগত সাক্ষরতা নয়, প্রয়োজন বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য কার্যকর সাক্ষরতার। এটি অর্জন সম্ভব নয় বিচ্ছিন্ন প্রকল্প বা কাগজে-কলমে অগ্রগতি দিয়ে; প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কৌশল। শিক্ষায় প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন তিনটি মৌলিক উদ্যোগ- প্রথমত, শিক্ষাকে দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। যে পরিবার প্রতিদিন দু’মুঠো খাবার নিয়ে অনিশ্চিত, তাদের শিশু বিদ্যালয়ে থাকলেও শেখার মান ভালো হবে না। তাই দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বৃত্তি, খাদ্য সহায়তা ও পরিবারভিত্তিক সমর্থন বাড়ানোর বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, প্রকল্পগুলো হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থার ওপর দাঁড়ানো। শুধুমাত্র প্রকল্প গ্রহণ নয়, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতার মাধ্যমে। তৃতীয়ত, শিক্ষাকে কর্মমুখী দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর চলমান কর্মসূচি যেমন সাক্ষরতার পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে - এ রকম উদ্যোগ সম্প্রসারিত করা জরুরি। এতে শিক্ষার্থী শুধু পড়তে-লিখতেই শিখবে না, জীবন-জীবিকার জন্য দক্ষতাও অর্জন করবে। শিক্ষার মান উন্নয়ন, ঝরে পড়া কমানো এবং কার্যকর সাক্ষরতা অর্জন এসবই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে লোক দেখানো প্রকল্প না নিয়ে বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। শিক্ষার আলোকে ছড়িয়ে দিতে হলে দরকার সততা, দূরদৃষ্টি এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এখনই সময় শিক্ষা খাতের প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সার্বিক সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। অন্যথায় বড় অঙ্কের বাজেট ব্যয় করেও শিক্ষা খাতে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে না। শিক্ষা শুধু জাতির মেরুদ- নয়, এটাই উন্নয়ন, অগ্রগতি ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের মূল চাবিকাঠি।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com