সুনামগঞ্জে এবার রোপা আমনে বা¤পার ফলন হয়েছে - এ খবর নিঃসন্দেহে কৃষি অর্থনীতির জন্য আশার আলো। দিগন্তজোড়া সোনালি ধানের ক্ষেতে কৃষকের পরিশ্রম যেন পূর্ণতার মুখ দেখেছে। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত, পোকার আক্রমণ না থাকা - সবকিছুর সমন্বয়ে এ বছর বিঘাপ্রতি ১৫-২০ মণ পর্যন্ত ফলন হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল জাতের ধানে আরও বেশি। ফলনে কৃষক খুশি, কিন্তু বাজারদরে নয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের কৃষকের সুখ-দুঃখের সমীকরণ এখনো নির্ধারিত হয় ‘দাম’ নামক একককে ঘিরে। বিঘাপ্রতি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক, পরিবহন, সব খাতে খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। অথচ মাঠে ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত ধান যখন পাইকারের কাছে হাজার টাকা মণে বিক্রি করতে হয়, তখন লাভ তো দূরের কথা - অনেক সময় খরচই উঠে না। এতে কৃষকের চোখে শুধু হতাশার কালো মেঘই জমে।
সুনামগঞ্জের কুরবানগরের কৃষক ছমির উদ্দিন কিংবা আব্দুস সালামদের মতো হাজারো চাষীর কণ্ঠে একই সুর- “ফলন ভালো, কিন্তু দামের অভাবে লাভ নেই।”
অন্যদিকে সরকারি পর্যায়ে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা উৎপাদনের তুলনায় অত্যন্ত কম। ৮২ হাজার ৬৫৬ হেক্টর জমিতে চাষকৃত আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা যেখানে দুই লাখ টনেরও বেশি, সেখানে সরকারি সংগ্রহ মাত্র ৬৬২ টন - সংখ্যাটি যে প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য, তা বলাই বাহুল্য। এতো কম সংগ্রহে বাজারে ন্যায্য দামের নিশ্চয়তা আসবে কীভাবে?
সরকার ১,৩৬০ টাকা মণ দরে ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ, কিন্তু সংগ্রহের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য না হলে বাজারে তার প্রভাব সীমিতই থাকবে। বা¤পার ফলনের সাথে ন্যায্য দাম নিশ্চিত না হলে কৃষকের প্রাপ্তি কোথায়? বাংলাদেশের কৃষক বারবার একই সমস্যার মুখোমুখি হন- ফসল ভালো হলে দাম পড়ে যায়। ফলন কম হলে বাজারে দাম বাড়ে, কিন্তু তখন কৃষকের ঘর থাকে খালি। এই দোদুল্যমান বাস্তবতায় কৃষির স্থিতিশীলতা কোথায়?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বলেছেন, ফলন ভালো হলে বাজারে প্রভাব পড়বে। কিন্তু বাজার যেন কৃষককে ঠকানোর সুযোগ না পায়, সেই নিশ্চয়তা দিতেও সরকারের কার্যকর ভূমিকা জরুরি।
আমরা মনে করি, সরকারি সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। এতে বাজারে ন্যায্য দামের চাপ তৈরি হবে। এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরাসরি কৃষক-সরকার সংযোগ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল কৃষিপণ্য বিপণন প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষক যেন নিজের ধান ন্যায্য দামে বিক্রি করতে পারেন এই উদ্যোগও নেয়া উচিত। এছাড়া জেলায় জেলায় ধান শুকানো, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি সহায়তা বাড়ালে কৃষকের উপর চাপ কমবে। ঋণ পরিশোধে কৃষকদের জন্য সহজ শর্ত ও সুদ কমানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জে আমনের বা¤পার ফলন অবশ্যই সুখবর। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে তখনই, যখন তিনি তার উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম হাতে পাবেন। কৃষিপ্রধান দেশের অর্থনীতিকে শক্ত রাখতে হলে কৃষকের স্বার্থই হতে হবে প্রথম অগ্রাধিকার। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে, ন্যায্য দাম নিশ্চিত করে কৃষকের ঘরে সমৃদ্ধি পৌঁছে দিতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ধান ওঠার মৌসুমে কৃষকের শঙ্কা যেন হাসিতে পরিণত হয়- এটাই সময়ের দাবি।