সুনামগঞ্জ আজ এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। হাওর-নদীর এই শান্ত জেলার ভেতরে নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট- ইয়াবা ব্যবসার অদৃশ্য সা¤্রাজ্য। যে শহরে একসময় মদ ও গাঁজার সীমিত চোরাচালানই ছিল মাথাব্যথার কারণ, সেখানে এখন ইয়াবার আগ্রাসন পরিণত হয়েছে জনস্বাস্থ্য, সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় হুমকিতে।
সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় সুনামগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই পাচারকারীদের নজরে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-মিয়ানমার রুট হয়ে ইয়াবার ¯্রােত যেভাবে বয়ে আসছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়- এটি ধ্বংসাত্মক। শহর থেকে গ্রাম - আরপিননগর, বড়পাড়া, কালিপুর, তেঘরিয়া, উকিলপাড়া, হাছননগর, ধোপাখালি সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে গোপন আস্তানা ও সেলসম্যানের নেটওয়ার্ক। অল্প টাকায় মাদক সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হওয়ায় উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণী সবচেয়ে বড় শিকার।
অপরাধবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মই বলে- মাদকের বিস্তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অপরাধকে বহুগুণ বাড়ায়। ইয়াবার নেশা জোগাতে ঘটছে চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক অশান্তি ও সহিংসতা। কিন্তু এর চেয়েও গুরুতর হচ্ছে-এই নেশার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা গডফাদারদের দুঃসাহস। সুনামগঞ্জের ‘মাদক স¤্রাট’ পঙ্কজের উদাহরণটি তাই এ জেলায় মাদকের অবাধ বিচরণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ১৮টি মামলার আসামি হয়েও সে বছরের পর বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে - এটি শুধু এক ব্যক্তির দৌরাত্ম্য নয়, বরং আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করে। ডিবি পুলিশের অভিযানে পঙ্কজের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হলেও, মূল অভিযুক্তের পলায়ন আবারও প্রমাণ করে এই নেটওয়ার্ক কতটা শক্তিশালী।
এ অবস্থায় জেলার নবাগত পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেনের জিরো টলারেন্স ঘোষণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন- পুলিশের কেউ যদি মাদকের দালালদের আশ্রয় দেয়, প্রমাণসহ জানাতে হবে; ব্যবস্থা তিনি নিশ্চিত করবেন। এই কঠোর অবস্থান জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, যদি এটি বাস্তবে রূপ পায়।
আমরা মনে করি, মাদকের বিস্তার রোধে শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। সীমান্তে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা; তালিকাভুক্ত ডিলার ও গডফাদারদের দ্রুত গ্রেফতার, জামিন-পরবর্তী পুনরায় অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি; যুবসমাজকে পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং-এর আওতায় আনা এবং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় নেতৃত্বকে স¤পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না, পুরো একটি প্রজন্মকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। সুনামগঞ্জ আজ সেই অন্ধকারের কিনারায় দাঁড়িয়ে। এখনই যদি কঠোর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও সামাজিক প্রতিরোধে সবাই ঐক্যবদ্ধ না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে কঠিন।