রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার বদল যেমন বাস্তবতা, তেমনি বদলে যায় ক্ষমতার ভাষা, আচরণ এবং আক্রমণের ধরনও। কিন্তু উদ্বেগজনক হলো- আগে যারা অনলাইনে হেনস্তা ও দমন-পীড়নের শিকার ছিলেন, ক্ষমতার পালাবদলের পর তারাই যখন একই ধরনের সহিংস আচরণের পুনরাবৃত্তি করেন। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বক্তব্যে উঠে এসেছে সেই উদ্বেগজনক বাস্তবতা। তিনি বলেন, “যারা আগে মজলুম ছিল, তারা এখন জালিম সাজছে” - এই মন্তব্য শুধুই রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক অনলাইন সংস্কৃতির এক অসুস্থ প্রতিফলন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত ‘বট বাহিনী’ বা ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত অ্যাকাউন্টের আক্রমণ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ঘটনার সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতির বিভিন্ন প্রান্ত, মত-পথ নির্বিশেষে - সবখানেই এই সন্ত্রাসী অনলাইন আচরণ দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সামাজিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করে, গণতান্ত্রিক সংলাপকে দুর্বল করে এবং নাগরিককে নাগরিকের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়।
সম্প্রতি রমনার বিস মিলনায়তনে উইমেন ইন ডেমোক্রেসি (উইন্ড) আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা তুলে ধরেছেন আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপট। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম আট-নয় মাসে ২ হাজারের বেশি আন্দোলন, রাজনৈতিক দলগুলোর সীমিত সহযোগিতা, এবং ‘ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন’-এর মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতি নষ্ট হওয়া - এসবই ছিল অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর বিশ্লেষণ। এই অস্থিরতায় নারীর ক্ষমতায়নও স্থবির হয়ে পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সত্যিই, জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনের আশা ছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায় তাই এড়ানো যায় না। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না যুক্তিযুক্তভাবেই বলেছেন- রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত প্রতিশ্রুতি ছাড়া নারী ক্ষমতায়ন বা সামাজিক পরিবর্তন আসবে না। বিএনপির পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের ঘোষণা ইতিবাচক; কিন্তু এই ধরনের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা জরুরি।
জোনায়েদ সাকি যে প্রশ্ন তুলেছেন- “একটি দলের আসল বক্তব্য কি ইশতেহার, নাকি তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার দলের কথাবার্তা?” - এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষাই মানুষের রাজনৈতিক চেতনায় বড় প্রভাব ফেলছে। সেখানে যদি বিদ্বেষ, বুলিং, মিথ্যাচার ও সংগঠিত আক্রমণই রাজনীতির ‘আসল মুখ’ হয়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্রের মূল চেতনা, অসহমতের প্রতি সম্মান - অবক্ষয়ের মুখে পড়ে।
আমরা ভুলে যেতে পারি না, একসময় যাদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল, তারা যদি একই আচরণ পুনরাবৃত্তি করেন, তবে সেটি শুধুই নৈতিক পরাজয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। সাইবার সহিংসতা কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়- এটি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে।
রাজনীতি বদলাতে পারে, কিন্তু নাগরিক আচরণের নীতি বদলানো যাবে না। ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়, কিন্তু দায়িত্ববোধ স্থায়ী হওয়া উচিত। অতএব এখন সময়- রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নিজেদের অনলাইন কাঠামো পর্যালোচনা করা; সরকারের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সুরক্ষায় নজর দেওয়া; নাগরিকদের জন্য নিজের আচরণের দায় স্বীকার করা।
আমরা মনে করি, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনে নয়, আচরণে প্রতিষ্ঠিত হয়। মজলুম থেকে জালিম হওয়া নয়, মজলুমের অভিজ্ঞতা থেকেই ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তি আসা উচিত।