দরিদ্র নারীর মুখে হাসি ফোটানোর উদ্দেশ্যে সরকার পরিচালিত “ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি)” কর্মসূচি এক মহৎ উদ্যোগ। প্রতি দুই বছরের এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো গ্রামের হতদরিদ্র নারীদের খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সুনামগঞ্জে এই মানবিক কর্মসূচিটিই এখন রূপ নিচ্ছে এক মুনাফাখোর মহলের আয়ের উৎসে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। ভিডব্লিউবি কার্ডে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিদের যোগসাজশে অর্থ লেনদেন হচ্ছে প্রকাশ্যে। একজন উপকারভোগীকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে দিতে হচ্ছে দেড় থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ। অথচ এই সহায়তা তো তাদের জন্য, যাদের ঘরে চুলা জ্বলে না, যাদের শিশুরা না খেয়ে ঘুমায়! কিন্তু তালিকায় জায়গা পাচ্ছেন অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তি, বাদ পড়ছেন প্রকৃত দরিদ্ররা।
শুধু নাম বিক্রি নয়, গত মেয়াদে উপকারভোগীদের সঞ্চিত টাকাও ফেরত দেওয়া হয়নি - এমন অভিযোগও উঠেছে। কিছু ইউনিয়নে লাখ লাখ টাকার এই সঞ্চয় আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে জানা যায়। অথচ এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষের নীরবতা বা দায়সারাভাবে দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জ মহিলা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের বক্তব্যেই অনিয়মের স্বীকারোক্তি মিলেছে। তিনি স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন উপজেলায় ভিডব্লিউবি কর্মসূচির নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আছে। অথচ এখনও পর্যন্ত দৃশ্যমান শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি - যা আরও দুঃসাহস যোগাচ্ছে দুর্নীতিবাজদের।
এ অবস্থায় প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ। আমরা চাই, প্রকৃত দরিদ্র নারীদের নাম নিশ্চিত করতে প্রতিটি ইউনিয়নের ভিডব্লিউবি তালিকা পুনঃযাচাই করা হোক। পাশাপাশি অর্থ লেনদেনে জড়িতদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। একই সাথে উপকারভোগীদের সঞ্চয় ফেরতের বিষয়টি অবিলম্বে নিষ্পত্তি করা জরুরি। এছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে ডিজিটাল আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল রাস্তা-ঘাট নয়, বরং সবচেয়ে অসহায় নাগরিকের মুখে একবেলা আহার তুলে দিতে পারলেই তা অর্থবহ হয়। দুঃস্থ নারীদের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই অনৈতিক বাণিজ্য থামাতে না পারলে কল্যাণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দারিদ্র্যকে পুঁজি করে যারা দুর্নীতি করে- তারা সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণি। তাদের বিচারের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।