বিশ্বজিত রায় ও মো. বায়েজীদ বিন ওয়াহিদ ::
চলতি অর্থবছরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিধবা ও অসহায় নারীদের জন্য বরাদ্দ ভিডব্লিউবি কার্ড (ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট) যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
জেলার একাধিক উপজেলার ইউনিয়নে প্রাথমিক যাচাইয়ের সময় নাম থাকলেও চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে টাকার বিনিময়ে একাধিক অযোগ্য নারীরা তালিকাভুক্ত হয়েছে। এতে বাদ পড়েছে প্রকৃত অসহায় গ্রামীণ নারীরা। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে এসব অনিয়ম-দুর্নীতির নানা কথা।
জানাযায়, সুনামগঞ্জ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত এবছর ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় জেলায় ২৩ হাজার ৬১৫ জন নারীকে খাদ্য সহায়তা বিতরণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যা গ্রামীণ দরিদ্র্য নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে দুই বছর পর্যন্ত প্রতিজন উপকারভোগী মাসে ৩০ কেজি করে চাল পাবেন। একেকজন দুই বছর খাদ্য সহায়তা পাওয়ার পর পরবর্তী চার বছর এ সুবিধা পাবেন না। যা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে চাল বিতরণ শুরু হয়েছে জেলা জুড়ে। তবে এই তালিকা প্রস্তুতের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন ইউনিয়নে অর্থ লেনদেন, যোগসাজশ ও অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ। অনেক দরিদ্র নারী বাদ পড়ে টাকার বিনিময়ে স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যরা হয়েছেন উপকারভোগী।
তাছাড়া গেল মেয়াদে অনেক ইউনিয়নে উপকারভোগীর সঞ্চয়কৃত টাকা ফেরত না দেওয়ারও অভিযোগ আছে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে।
এবার অনেক ইউনিয়নে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দরিদ্রের বাদ দিয়ে স্বচ্ছলদের নাম যুক্ত করা হয়েছে তালিকায়। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার যোগসাজশে ইউনিয়ন পরিষদের কতিপয় লোকজন জড়িত বলছেন খোদ কর্মকর্তা, ইউপি সদস্যসহ বঞ্চিত অনেকেই। তথ্যানুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এর সত্যতাও পাওয়া গেছে।
অফিসে তথ্য চাইতে গেলে বাঁধা..
সম্প্রতি জামালগঞ্জ মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত তথ্য চাইতে গেলে অফিস সহকারীর সাথে বাগবিতন্ডা হয় এ প্রতিবেদকের। একপর্যায়ে তথ্য নিয়ে দুই আনার লাভও হবে না বলে দম্ভ প্রকাশ করেন অফিস সহকারী মোজাম্মেল।
"টাকা না দিলে নাম বাদ" অডিওতে অনৈতিক লেনদেনের প্রমাণ...
ভিডব্লিউবি কার্ড বিতরণে অনৈতিক লেনদেন সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তাতে বলতে শোনা যায়, ‘হ্যালো, আফাই ভাই। আফনে এখন বেহেলী নি?’ ‘না, আমি সাচনা বাজারে।’ ‘আমারে চিনছইন? আমি জুলেখার (ছদ্মনাম) জামাই।’ ‘চিনছি।’ ‘হেরা চারজনে দেড় হাজার কইরা দিছে না?’ অপর প্রান্ত থেকে আফাই মিয়ার ‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর। ‘এখন আমার টেকাডা (টাকাটা) দেওয়ন (দেওয়া) লাগে। না হইলে আমার নামডা বাদ যাইবো। আমি গরিব মানুষ।’ আফাই মিয়া- ‘আপনার ওয়াইফ বেহেলী আইছিল নি?’ ‘গেছিলো। টেকা দিছে না, তাই নাম দিত না কইছে।’ পাল্টা ধমকের সুরে আফাই মিয়া বলেন, ‘আপনারা তো পন্ডিত মানুষ। পন্ডিতি কইরা মেম্বারের কাছে গেছিলেন।’ ‘না ভাই, আমি মেম্বারের কাছে গেছি না।’ ‘তর্ক ধইরেন না। এতদিন ফোন দিলেন না। আজকে ফোন দিছেন কিসের জন্য।’ ‘ফোন দিছি টেকা দেওয়ার লাগি। আপনার বিকাশ নাম্বারটা কইন।’ ‘তুলেন ...., পার্সোনাল।’ টাকা পাঠানোর পর- ‘হ্যালো, দেড় হাজার টেকা পাঠাইছি। লাস্টে তেত্রিশ। দেখইন গেছেনি।’ অপর প্রান্ত থেকে- ‘আচ্ছা, ওকে।’
ইউপি সদস্যসহ জেলাজুড়ে নানা অভিযোগ...
টাকা প্রদানকারী আশরাফুল (ছদ্মনাম) বলেন, টাকা দিলেও আমার বৌয়ের (স্ত্রী) নাম বাতিল কইরা দিছে। ইউনিয়ন অফিসে টাকা চাইতে গেলে তারা কইছে পরবর্তীতে নাম দিয়া দিব। আমরার গ্রামের জাকির হোসেন, আবুল হোসেন, বুলবুল, আমিরুল, আল-আমিন এই পাঁচজনে টেকা (টাকা) দিছে। হেরার নাম হইছে, কিন্তু আমার নাম নাই।
পরিচয় গোপনের শর্তে জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য জানিয়েছেন, তাঁর ইউনিয়নে অনেক নাম টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে নামগুলো তালিকায় যুক্ত করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, ‘গণশুনানীর দিন কেউ আসেনি তাই তাঁর ওয়ার্ডের সব নাম বাদ পড়েছে। নামগুলো কেন বাদ পড়েছে? জিজ্ঞেস করলে, বলা হয়- সব চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তাঁর ওয়ার্ডের যে পাঁচজন টাকা দিয়েছে জরুরি ভিত্তিতে গণশুনানীর দিন তাদের ডেকে আনা হয়েছে। তাদের কাছে আফাই মিয়ার তরফ থেকে প্রথমে তিন হাজার টাকা দাবি করা হলেও পরে দেড় হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে অভিযোগ ওই জনপ্রতিনিধির।’ তিনি বলেন, ‘টাকা নেওয়ার বিষয়টি চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে জানালে তারা অভিযুক্তকে কিছু না বলে উপরন্তু আমাকে তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন।’
বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুজন দাস ও উদ্যোক্তা আফাই মিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গণশুনানীর মাধ্যমে সব যাচাই-বাছাই হয়েছে। আমরা এর সাথে জড়িত না।
সুনামগঞ্জ মহিলা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ মেয়াদে জেলার ২৩ হাজার ৬১৫ জন উপকারভোগী ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২ হাজার ১৩৩, বিশ্বম্ভরপুরে ২ হাজার ২৬৩, ছাতকে ২ হাজার ১৪৫, দিরাইয়ে ২ হাজার ৭৮, ধর্মপাশায় ২ হাজার ১৬৮, দোয়ারাবাজারে ২ হাজার ২০৭, জগন্নাথপুরে ২ হাজার ৭৩, জামালগঞ্জে ২ হাজার ২১৩, শাল্লায় ২ হাজার ১৬২, শান্তিগঞ্জে ১ হাজার ৯৮৩ ও তাহিরপুরে ২ হাজার ১৯০ জন।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহজাহান সিরাজ বলেন, আমি যতটুকু জানি ভিডব্লিউবির উপকারভোগী নির্বাচনে মতামত নেওয়া হয়নি। গণশুনানীর নিয়ম রক্ষার কার্যক্রম দেখা ছাড়া কোন সম্পৃক্ততা ছিল না আমাদের। বঞ্চিতরা এ সম্পর্কে আমাদের কাছে জানতে চায়। আমরা কোন সদুত্তর দিতে পারি না। এর মাধ্যমে আমাদেরকে ছোট করা হয়েছে।
শাল্লার এক গণমাধ্যমকর্মী বলেন, "টাকা ছাড়া এসব কাজ হয় না, এটা আমি-আপনি সবাই জানি। কিন্তু যারা টাকা দেয় তারা সেটা স্বীকার করে না। বঞ্চিত কিছু মানুষ টাকা লেনদেনের বিষয়টি বলে, কিন্তু প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে টাকা লেনদেন হয়, এটা ঠিক"। গেল মেয়াদে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে জানিয়ে শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য সহদেব দাস বলেন, "ভিডব্লিউবির তালিকা প্রস্তুতের কার্যক্রম চলছে। যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। একজন আর্থিক লেনদেনের সাথে জড়িত ছিল। সে এখন পরিষদে নেই।"
তাহিরপুরের উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন মুঠোফোনে জানিয়েছেন, গত মেয়াদে ৪০০ উপকারভোগী প্রতি মাসে সঞ্চয় বাবদ প্রায় ১৯ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন, সেটা ফেরত দেওয়া হয়নি। চেয়ারম্যান সাহেব গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় সময় চেয়েছেন। তবে নতুন মেয়াদে কারও কাছ থেকে কোন ধরনের টাকা নেওয়া হয়নি।
"চেয়ারম্যানরাই দায়ী" মহিলা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের স্বীকারোক্তি...
সুনামগঞ্জ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ জে এম রেজাউল আলম অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর এই চার উপজেলায় কি হচ্ছে সেটা আমি জানি না। তবে এ উপজেলাগুলোতে ভিডব্লিউবির নামে টাকা আত্মসাতের মৌখিক অভিযোগ আছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখেও কোন ফল পাইনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সঞ্চয়ের টাকা উপকারভোগীর নিজ নিজ অ্যাকাউন্টে রাখার কথা। কিন্তু এগুলো কিছু কিছু ইউনিয়নে আত্মসাত হয়েছে। এতে চেয়ারম্যানরা জড়িত।
চলতি অর্থবছরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিধবা ও অসহায় নারীদের জন্য বরাদ্দ ভিডব্লিউবি কার্ড (ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট) যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
জেলার একাধিক উপজেলার ইউনিয়নে প্রাথমিক যাচাইয়ের সময় নাম থাকলেও চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে টাকার বিনিময়ে একাধিক অযোগ্য নারীরা তালিকাভুক্ত হয়েছে। এতে বাদ পড়েছে প্রকৃত অসহায় গ্রামীণ নারীরা। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে এসব অনিয়ম-দুর্নীতির নানা কথা।
জানাযায়, সুনামগঞ্জ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত এবছর ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় জেলায় ২৩ হাজার ৬১৫ জন নারীকে খাদ্য সহায়তা বিতরণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যা গ্রামীণ দরিদ্র্য নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে দুই বছর পর্যন্ত প্রতিজন উপকারভোগী মাসে ৩০ কেজি করে চাল পাবেন। একেকজন দুই বছর খাদ্য সহায়তা পাওয়ার পর পরবর্তী চার বছর এ সুবিধা পাবেন না। যা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে চাল বিতরণ শুরু হয়েছে জেলা জুড়ে। তবে এই তালিকা প্রস্তুতের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন ইউনিয়নে অর্থ লেনদেন, যোগসাজশ ও অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ। অনেক দরিদ্র নারী বাদ পড়ে টাকার বিনিময়ে স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যরা হয়েছেন উপকারভোগী।
তাছাড়া গেল মেয়াদে অনেক ইউনিয়নে উপকারভোগীর সঞ্চয়কৃত টাকা ফেরত না দেওয়ারও অভিযোগ আছে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে।
এবার অনেক ইউনিয়নে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দরিদ্রের বাদ দিয়ে স্বচ্ছলদের নাম যুক্ত করা হয়েছে তালিকায়। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার যোগসাজশে ইউনিয়ন পরিষদের কতিপয় লোকজন জড়িত বলছেন খোদ কর্মকর্তা, ইউপি সদস্যসহ বঞ্চিত অনেকেই। তথ্যানুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এর সত্যতাও পাওয়া গেছে।
অফিসে তথ্য চাইতে গেলে বাঁধা..
সম্প্রতি জামালগঞ্জ মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত তথ্য চাইতে গেলে অফিস সহকারীর সাথে বাগবিতন্ডা হয় এ প্রতিবেদকের। একপর্যায়ে তথ্য নিয়ে দুই আনার লাভও হবে না বলে দম্ভ প্রকাশ করেন অফিস সহকারী মোজাম্মেল।
"টাকা না দিলে নাম বাদ" অডিওতে অনৈতিক লেনদেনের প্রমাণ...
ভিডব্লিউবি কার্ড বিতরণে অনৈতিক লেনদেন সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তাতে বলতে শোনা যায়, ‘হ্যালো, আফাই ভাই। আফনে এখন বেহেলী নি?’ ‘না, আমি সাচনা বাজারে।’ ‘আমারে চিনছইন? আমি জুলেখার (ছদ্মনাম) জামাই।’ ‘চিনছি।’ ‘হেরা চারজনে দেড় হাজার কইরা দিছে না?’ অপর প্রান্ত থেকে আফাই মিয়ার ‘হ্যাঁ’ সূচক উত্তর। ‘এখন আমার টেকাডা (টাকাটা) দেওয়ন (দেওয়া) লাগে। না হইলে আমার নামডা বাদ যাইবো। আমি গরিব মানুষ।’ আফাই মিয়া- ‘আপনার ওয়াইফ বেহেলী আইছিল নি?’ ‘গেছিলো। টেকা দিছে না, তাই নাম দিত না কইছে।’ পাল্টা ধমকের সুরে আফাই মিয়া বলেন, ‘আপনারা তো পন্ডিত মানুষ। পন্ডিতি কইরা মেম্বারের কাছে গেছিলেন।’ ‘না ভাই, আমি মেম্বারের কাছে গেছি না।’ ‘তর্ক ধইরেন না। এতদিন ফোন দিলেন না। আজকে ফোন দিছেন কিসের জন্য।’ ‘ফোন দিছি টেকা দেওয়ার লাগি। আপনার বিকাশ নাম্বারটা কইন।’ ‘তুলেন ...., পার্সোনাল।’ টাকা পাঠানোর পর- ‘হ্যালো, দেড় হাজার টেকা পাঠাইছি। লাস্টে তেত্রিশ। দেখইন গেছেনি।’ অপর প্রান্ত থেকে- ‘আচ্ছা, ওকে।’
ইউপি সদস্যসহ জেলাজুড়ে নানা অভিযোগ...
টাকা প্রদানকারী আশরাফুল (ছদ্মনাম) বলেন, টাকা দিলেও আমার বৌয়ের (স্ত্রী) নাম বাতিল কইরা দিছে। ইউনিয়ন অফিসে টাকা চাইতে গেলে তারা কইছে পরবর্তীতে নাম দিয়া দিব। আমরার গ্রামের জাকির হোসেন, আবুল হোসেন, বুলবুল, আমিরুল, আল-আমিন এই পাঁচজনে টেকা (টাকা) দিছে। হেরার নাম হইছে, কিন্তু আমার নাম নাই।
পরিচয় গোপনের শর্তে জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য জানিয়েছেন, তাঁর ইউনিয়নে অনেক নাম টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে নামগুলো তালিকায় যুক্ত করেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, ‘গণশুনানীর দিন কেউ আসেনি তাই তাঁর ওয়ার্ডের সব নাম বাদ পড়েছে। নামগুলো কেন বাদ পড়েছে? জিজ্ঞেস করলে, বলা হয়- সব চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তাঁর ওয়ার্ডের যে পাঁচজন টাকা দিয়েছে জরুরি ভিত্তিতে গণশুনানীর দিন তাদের ডেকে আনা হয়েছে। তাদের কাছে আফাই মিয়ার তরফ থেকে প্রথমে তিন হাজার টাকা দাবি করা হলেও পরে দেড় হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে অভিযোগ ওই জনপ্রতিনিধির।’ তিনি বলেন, ‘টাকা নেওয়ার বিষয়টি চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে জানালে তারা অভিযুক্তকে কিছু না বলে উপরন্তু আমাকে তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন।’
বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুজন দাস ও উদ্যোক্তা আফাই মিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গণশুনানীর মাধ্যমে সব যাচাই-বাছাই হয়েছে। আমরা এর সাথে জড়িত না।
সুনামগঞ্জ মহিলা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ মেয়াদে জেলার ২৩ হাজার ৬১৫ জন উপকারভোগী ভিডব্লিউবি কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২ হাজার ১৩৩, বিশ্বম্ভরপুরে ২ হাজার ২৬৩, ছাতকে ২ হাজার ১৪৫, দিরাইয়ে ২ হাজার ৭৮, ধর্মপাশায় ২ হাজার ১৬৮, দোয়ারাবাজারে ২ হাজার ২০৭, জগন্নাথপুরে ২ হাজার ৭৩, জামালগঞ্জে ২ হাজার ২১৩, শাল্লায় ২ হাজার ১৬২, শান্তিগঞ্জে ১ হাজার ৯৮৩ ও তাহিরপুরে ২ হাজার ১৯০ জন।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহজাহান সিরাজ বলেন, আমি যতটুকু জানি ভিডব্লিউবির উপকারভোগী নির্বাচনে মতামত নেওয়া হয়নি। গণশুনানীর নিয়ম রক্ষার কার্যক্রম দেখা ছাড়া কোন সম্পৃক্ততা ছিল না আমাদের। বঞ্চিতরা এ সম্পর্কে আমাদের কাছে জানতে চায়। আমরা কোন সদুত্তর দিতে পারি না। এর মাধ্যমে আমাদেরকে ছোট করা হয়েছে।
শাল্লার এক গণমাধ্যমকর্মী বলেন, "টাকা ছাড়া এসব কাজ হয় না, এটা আমি-আপনি সবাই জানি। কিন্তু যারা টাকা দেয় তারা সেটা স্বীকার করে না। বঞ্চিত কিছু মানুষ টাকা লেনদেনের বিষয়টি বলে, কিন্তু প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে টাকা লেনদেন হয়, এটা ঠিক"। গেল মেয়াদে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে জানিয়ে শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য সহদেব দাস বলেন, "ভিডব্লিউবির তালিকা প্রস্তুতের কার্যক্রম চলছে। যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। একজন আর্থিক লেনদেনের সাথে জড়িত ছিল। সে এখন পরিষদে নেই।"
তাহিরপুরের উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন মুঠোফোনে জানিয়েছেন, গত মেয়াদে ৪০০ উপকারভোগী প্রতি মাসে সঞ্চয় বাবদ প্রায় ১৯ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন, সেটা ফেরত দেওয়া হয়নি। চেয়ারম্যান সাহেব গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় সময় চেয়েছেন। তবে নতুন মেয়াদে কারও কাছ থেকে কোন ধরনের টাকা নেওয়া হয়নি।
"চেয়ারম্যানরাই দায়ী" মহিলা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের স্বীকারোক্তি...
সুনামগঞ্জ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ জে এম রেজাউল আলম অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর এই চার উপজেলায় কি হচ্ছে সেটা আমি জানি না। তবে এ উপজেলাগুলোতে ভিডব্লিউবির নামে টাকা আত্মসাতের মৌখিক অভিযোগ আছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখেও কোন ফল পাইনি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সঞ্চয়ের টাকা উপকারভোগীর নিজ নিজ অ্যাকাউন্টে রাখার কথা। কিন্তু এগুলো কিছু কিছু ইউনিয়নে আত্মসাত হয়েছে। এতে চেয়ারম্যানরা জড়িত।