সুনামগঞ্জ হাওর অধ্যুষিত একটি জেলা, যেখানে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িয়ে আছে কৃষি, মৎস্য ও প্রবাসী আয়ে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বছরের অনেকটা সময় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। এই প্রেক্ষাপটে রেলপথ সম্প্রসারণ শুধু ছাতকের জন্য নয়, সুনামগঞ্জ জেলার প্রতিটি মানুষের জন্যই এক জরুরি প্রয়োজন।
ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত রেললাইন একসময় এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু নানা অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও বন্যার ক্ষতিতে রেলপথ আজ প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। সম্প্রতি গণদাবি পরিষদ ছাতক-দোয়ারা ৭ দফা দাবির স্মারকলিপি দিয়ে রেলপথ সংস্কার ও ছাতক থেকে ঢাকা পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবি তুলেছে, যা প্রশংসনীয়। তবে সেখানেই থেমে গেলে চলবে না; সুনামগঞ্জ জেলা শহর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করাও সমান জরুরি।
আমরা জানি, সুনামগঞ্জ থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ টন ধান ও মৎস্য উৎপাদিত হয়। সড়কপথে এগুলো ঢাকা বা দেশের অন্যান্য বাজারে পৌঁছাতে সময়, খরচ ও ঝুঁকি অনেক বেশি। রেলপথ হলে কৃষক ও জেলেরা ন্যায্য দাম পাবে, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে। এছাড়া সরাসরি রেল সংযোগ পেলে সুনামগঞ্জ জেলাবাসীর যাতায়াত হবে দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।
আমাদের সুনামগঞ্জের শিক্ষার্থীদের সিলেট ও ঢাকায় পড়তে যেতে হয়। রোগীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে যান। রেল সংযোগ পেলে তাদের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমবে। পাশাপাশি, টাঙ্গুয়ার হাওর, বারেক টিলা, লাউড়ের গড়সহ অসংখ্য প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থানে দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটক আসেন। রেল সংযোগ হলে এ খাতের বিকাশ বহুগুণ বাড়বে।
ব্রিটিশ আমলে সিলেট থেকে ছাতক পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হয়েছিল শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রয়োজনে। পরে পরিকল্পনা ছিল সেখান থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা। কিন্তু নানা কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ এখনকার প্রেক্ষাপটে এটি আর বিলাসিতা নয়, বরং জনজীবন ও অর্থনীতির অপরিহার্য দাবি।
ছাতক-ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত রোপওয়ে একসময় এ অঞ্চলের প্রাণ ছিল। সেটি পুনরায় চালু করে পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব। একইভাবে ছাতক-দোয়ারা হয়ে সুনামগঞ্জ থেকে মোহনগঞ্জ পর্যন্ত নতুন রেললাইন হলে শুধু সুনামগঞ্জ নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি- ছাতক থেকে ঢাকা পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেন চালুর পাশাপাশি সুনামগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণকে জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হোক। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক স্বার্থ বা আমলাতান্ত্রিক বিলম্বের কারণে এ প্রকল্প যেন আবারও আটকে না যায়।