নুরুননাহার লোনা ::
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে একসময় চাষ হতো নানা স্বাদ, রং ও বৈশিষ্ট্যের দেশি ধান। বোরো, আমন ও আউশ - তিন মৌসুমেই ছিল এসব ধানের আবাদ। কৃষকের জীবন-জীবিকা, স্থানীয় পরিবেশ ও খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল দেশি ধানের এসব জাত। এসব ধানের চাল দিয়ে তৈরি হতো নানা ধরনের পিঠা, পায়েস, মুড়ি, খৈ ও চিড়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে চাষাবাদের ধরন। জলবায়ু পরিবর্তন, আগাম বন্যা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ধানের বিস্তারে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি ধানের বহু জাত। অধিক ফলনের আশায় কৃষকেরাও ঝুঁকছেন আধুনিক জাতের ধান চাষে।
তাহিরপুর উপজেলার দেখার হাওরের ষাটোর্ধ্ব কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, দাদার আমল থেকেই ধান চাষের সঙ্গে আছি। আগে এই হাওরে টেপি, গাছি, শাইল, নাজিরশাইল, রঙ্গিলা টেপি, লাকাই, পানিশাইল, বেগুনবিচি, বোরো জিরা, মধুমাধব, মালতি, কালোজিরাসহ নানা জাতের ধান চাষ হতো। কিন্তু পরপর তিনবার আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক সর্বস্বান্ত হন। খড়ের অভাবে আমার ২৩টি গরুও মারা যায়। এরপর ধীরে ধীরে কৃষকেরা হাইব্রিড ও উচ্চফলনশীল বোরো ধান চাষ শুরু করেন। এসব ধানে ফলন বেশি হওয়ায় দেশি জাতের চাষ কমতে থাকে। এখন আগের অনেক জাতের ধান চোখেই পড়ে না। আগে প্রতি বছর পরের মৌসুমের জন্য নিজেরাই বীজ সংরক্ষণ করতাম। এখন বাজারে সহজেই বীজ পাওয়া যায়। তাই বীজ সংরক্ষণের সেই চর্চাও কমে গেছে।
দেশি ধানের হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা অনেক অনুষঙ্গও। স্মৃতিচারণা করে এই কৃষক বলেন, আগে অগ্রহায়ণে ধান তোলার পর বাড়িতে পিঠা-পায়েসের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ত। সেই খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ এখন আর পাওয়া যায় না। আগের সেই দিনগুলোও যেন হারিয়ে গেছে।
তাহিরপুর উপজেলার শনি, মাটিয়ান, মহালিয়া ও বড়দল-গুরমা হাওরেও একসময় বিভিন্ন জাতের দেশি বোরো ধানের চাষ হতো। ষাটোর্ধ্ব কৃষাণী রোকেয়া বেগম বলেন, আগে আমাদের হাওর এলাকায় কত রকমের দেশি ধান চাষ হতো। সেই ধান দিয়ে ঘরে খৈ, মুড়ি ও চিড়া তৈরি করতাম। ধানের চাল দিয়ে বানানো হতো নানা ধরনের পিঠাপুলি। আত্মীয়স্বজন বাড়িতে এলে নিজের ঘরের ধানের চিড়া, মুড়ি ও পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করতাম। ঘরের খৈ, চিড়া, আম-কাঁঠাল আর দই - এসব এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়। আমাদের সন্তানদের তো এসব খাবারের আগের স্বাদ ও ঘ্রাণ চেনানোর সুযোগই নেই। দেশি ধানের অনেক জাত এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বাজারের চাল দিয়ে সব ধরনের পিঠা বা খাবারের আগের সেই স্বাদও পাওয়া যায় না। শুধু ধানের জাতই হারাচ্ছে না, হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য, খাবারের স্বাদ ও সংস্কৃতি। নতুন প্রজন্মের জন্য এসব দেশি ধানের জাত সংরক্ষণ করা খুবই প্রয়োজন।
কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, দেশি ধানের তুলনামূলক কম ফলনের কারণে কৃষকেরা এসব জাতের চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বর্তমানে ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-২৯, ব্রি ধান-১২০ ও শক্তির মতো উচ্চফলনশীল জাতের আবাদ বেশি হচ্ছে। অন্যদিকে আদাবালাম, গোড়াই, তোপাবোরো ও লতিরাজের মতো দেশি ধানের জাতগুলো বিলুপ্তির পথে।
কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সুনামগঞ্জে মোট ২ লাখ ২২ হাজার ৭৪৫ হেক্টর বোরো আবাদি জমির মধ্যে দেশি জাতের ধান
চাষ হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৩৭০ হেক্টরে। অর্থাৎ মোট আবাদি জমির মাত্র ০.৬২ শতাংশে ছিল স্থানীয় জাতের ধান। ২০২৬ সালে মোট বোরো আবাদি জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫২১ হেক্টরে। কিন্তু দেশি জাতের ধানের আবাদ কমে হয়েছে মাত্র ৮৬৮ হেক্টর।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান মানিক বলেন, হাওরাঞ্চলে ধানের জাত নির্বাচনে ক্ষেত্রে আগাম বন্যা, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও জমির পানির অবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় দেশি ধানের জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে সেগুলোর বীজ সংরক্ষণ জরুরি। কোন জাত কি ধরনের প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে পারে তা গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। শুধু ফলন নয়, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃষি গবেষকের মতে, আগাম বন্যায় হাওরে ধান পাকার আগেই পানি চলে আসায় কৃষকেরা স্বল্প মেয়াদ ও দ্রুত পাকে এমন জাতের দিকে ঝুঁকছেন। বৃষ্টির সময় ও পরিমাণের পরিবর্তনের কারণে ধানের বীজতলা চাষের সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে। অতিরিক্ত গরম ও শীতের সময়ের পরিবর্তন ধানের বৃদ্ধি ও ফলনে প্রভাব ফেলে। দেশি ধান রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশি ধানের জাত সংরক্ষণে প্রথমেই প্রয়োজন হাওরভিত্তিক জরিপ। প্রবীণ কৃষকদের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া ধানের নাম, বৈশিষ্ট্য, ফলন, চাষের সময় এবং বন্যা সহনশীলতার পুষ্টি গুণ, সমৃদ্ধ জাতের জিন নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকের বাড়িতে বীজ সংরক্ষণ, স্থানীয় বীজ ব্যাংক গড়ে তোলা এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা জরুরি। দেশি ধানের অনেক জাতের মধ্যে স্থানীয় পরিবেশে টিকে থাকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষকেরা উপকৃত হতে পারবেন এবং আগামী প্রজন্ম পেতে পারে দেশি ধানের স্বাদ ও ঘ্রাণ।