কান নিয়েছে চিলে

আপলোড সময় : ০৬-১১-২০২৬ ০৯:৫৯:৪৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৬-১১-২০২৬ ১০:০০:৪৫ পূর্বাহ্ন
নাসরীন আক্তার রুবি:
সত্য হয় নিরেট, চমকহীন, আড়ম্বরহীন, চাকচিক্যহীন বলেই তা আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু মিথ্যের চমক থাকে, নানাবিধ আড়ম্বরে পূর্ণ থাকে; চমকপ্রদ উপস্থাপন, নাটকীয়তায়, রঙ চড়িয়ে, রোমাঞ্চ ও রহস্য, মুখরোচক গল্প নিয়ে সামনে আসে বলে তা লোকের কাছে খুবই পছন্দনীয়। মানুষ মুখরোচকতা, রহস্য, চমক পছন্দ করে আজন্ম থেকে তাই সত্যের চেয়ে মিথ্যের প্রচার বেশি হয়, যদিও তা সাময়িক। মিথ্যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, সাময়িক উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়াতে পারে। যখন মিথ্যের সাথে কিছুটা সত্যের মিশেল থাকে। তখন সেটা হয় গুজব। গুজবে গুজ গুজ (ফিস ফিস কথা) থাকে, থাকে গুঞ্জন (রহস্যরূপের জনন)। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে জনপদে। মানুষের ভাষা শেখা ও সমাজ গঠন শুরু যবে থেকে, গুজবের জন্মও তবে থেকে। মানুষের খবর ছড়ানোর মাধ্যম ছিল গুজব অর্থাৎ যোগাযোগের প্রাচীনতম মাধ্যম হল গুজব, যা বর্তমান ইন্টানেটের যুগেও বহাল তবিয়তে বিদ্যমান। নৃ-বিজ্ঞানীদের মতে গুহাযুগে যখন মানুষের ছোট ছোট দলে বাস করা ছিল তখন টিকে থাকার লড়াইয়ে নানান সম্ভাবনা ও আশংকা নিয়ে তারা পারস্পরিক আলোচনা বা এড়ংংরঢ় করত, এ থেকেই ক্রমে গুজবের জন্ম হয়। গ্রীক ও রোমান সভ্যতায় ফেম নামে এক দেবী ছিলেন যার কাজ ছিল গুজব ছড়ানো। ১৪শ শতকে ইউরোপে যখন প্লেগ মহামারি ছড়িয়ে পড়ে তখন কুয়োর পানিতে বিষ মেশানোর গুজব ছড়ানো হয়, ও হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। এছাড়া কোনো এলাকায় ফসল নষ্ট হলে কোনো নারীকে ডাইনি উপাধি দিয়ে তার উপর দায় চাপানো হত এবং জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। ছাপাখানা আবিষ্কারের পর (১৭শ থেকে ১৯শ শতক) গুজব ছড়ানোর মাত্রা বেড়ে যায় বহুগুণে। বর্তমানে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে গুজব যেন ডালপালা মেলে মব উদ্যমে সুপারসনিক গতি পেয়েছে। গুজবের অন্যতম মাধ্যম এখন সোশ্যাল মিডিয়া তথা ফেসবুক। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরকারি ‘জরুরি প্রস্তুতি’ বা ‘ইব জবধফু’ ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর গুজবে ছেয়ে গেছে। যুক্তরাজ্য সরকারের অফিসিয়াল নির্দেশনা অনুযায়ী, এটি একটি ৩ বছর মেয়াদী দীর্ঘমেয়াদী সচেতনতামূলক কর্মসূচি, যার উদ্দেশ্য হলো চরম আবহাওয়া (যেমন বন্যা, তীব্র ঝড়), সাইবার আক্রমণ বা হঠাৎ বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহে সাময়িক বিভ্রাট ঘটলে নাগরিকরা যেন প্রথম ৭২ ঘণ্টা নিজেদের সামলে নিতে পারেন। এটি মোটেও কোনো আসন্ন যুদ্ধ বা পারমাণবিক হামলার কারণে নয়। ইউরোপের দেশগুলোতে সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ও হিমাগার অচল হয়ে পড়েছে সাইবার এটাকের কারণে। ইন্টারনেট প্রযুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সুপারমার্কেটের এই বাণিজ্যিক ফ্রিজগুলোর নিয়ন্ত্রণ দূর থেকে (জবসড়ঃবষু) হ্যাক করে নেয় হ্যাকাররা। এরপর তারা ফ্রিজের কুলিং সিস্টেম বন্ধ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘ডিফ্রস্ট মোড’ চালু করে দেয়। এর ফলে ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় ও খাদ্যদ্রব্য পচে যায়। অনেকে এর সাথে তিনদিনের প্রস্তুতিকে মিলিয়ে ফেলেছেন। আসলে তা নয়। ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে সাইবার এটাক হতেই পারে। আমাদের দেশেও তো এন্ড্রয়েড বা স্মার্ট ফোন বা ডিভাইস হ্যাক করে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় হ্যাকাররা, ব্যাংকিং অ্যাপস থেকে টাকা নিয়ে নেয়, বিভিন্ন ভাবে প্রতারণা করে। গুজব রটিয়ে একপক্ষ স্বার্থ সংরক্ষণ করে সবসময়। আর মানুষ পছন্দ করে বলেই গুজব আরও দ্রুত ছড়ায়। গুজবে যতটা না ঘটনা, তারচে বেশি থাকে রটনা। আমরা দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গুজব রটাতে দেখেছি। এমন তো নয় যে প্রকৃত ঘটনা থেকে দৃষ্টি সরাতে গুজব রটানোর অপকৌশল অবলম্বন করা হয়! ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন, “সবচেয়ে বিপজ্জনক মিথ্যা হল সেই মিথ্যা যার সাথে কিছুটা সত্য মেশানো থাকে।” রাজনীতি বা যুদ্ধের ময়দানে অনেক সময় সত্যের একটি অংশকে আড়াল করে, বা আংশিক সত্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যা বিভ্রান্তি তৈরি করে। একে বলা হয় যধষভ-ঃৎঁঃয বা অর্ধত্য, যা মিথ্যার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কারণ এর মধ্যে সত্যের উপাদান থাকায় মানুষ একে খুব সহজে বিশ্বাস করে ফেলে। গুজব ছড়ানো হয় অনিশ্চয়তা থেকে, ভয় বা শূন্যতা পূরণের চেষ্টা, কারও প্রতি বিদ্বেষ প্রসূত হয়ে, শত্রুতা থেকে, বিজয়ী হওয়ার আকাক্সক্ষা থেকে। কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন পণ্ডশ্রম কবিতায়- “এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে, চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে” সত্যি, এখন এমন দিন এসেছে যে প্রতিনিয়ত গুজব ছড়াচ্ছে আর আমরা সত্যমিথ্যা যাচাই না করেই বিভ্রান্ত হচ্ছি। অথচ গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু হলে আমরা ফ্যাক্ট-চেক করে নিতে পারি। তা নয়, চিলের পিছে দৌড়ে দৌড়ে পণ্ডশ্রম করাই যেন আমাদের কাজ।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : dailysunamkantha@gmail.com
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com