একাত্তরে যাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, যাঁরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরই যদি হামলা, লুটপাট ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়, তবে তা শুধু একটি পরিবারের ওপর আঘাত নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের অঙ্গীকারের ওপরও আঘাত। শাল্লা উপজেলায় বীরাঙ্গনা জমিলা খাতুন ও তাঁর ভাই যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার পরিবারের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ এমনই এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর রাতে দৌলতপুর গ্রামে ওই পরিবারের বাড়িঘর ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাট চালানো হয়েছে। পরিবারের দাবি, ছয়টি গরু, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, ফ্রিজসহ মূল্যবান মালামাল লুট করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। হামলায় গর্ভবতী নারীসহ তিন নারী আহত হয়েছেন। আরও ভয়াবহ অভিযোগ, পরিবারের এক নারী ও তাঁর ১১ বছর বয়সী মেয়েকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে তা নিছক জমিজমা বা পূর্বশত্রুতার বিরোধ নয়; এটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ এবং মানবিক মর্যাদার ওপর নির্মম আঘাত।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী হওয়া এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা প্রতিপক্ষের নির্যাতন ও হুমকির শিকার হচ্ছেন। এমন অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে দেখা জরুরি। কারণ, বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তি বা পরিবারকে প্রতিশোধের শিকার হতে হলে তা আইনের শাসনের জন্য ভয়ংকর বার্তা বহন করে। রাষ্ট্রের কাছে সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে। একইভাবে বীরাঙ্গনা পরিবারের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষাও রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।
আমরা মনে করি, এ ঘটনায় শুধু অভিযোগ গ্রহণ করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। পুলিশকে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। অভিযুক্তদের পরিচয়, প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে। লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা এবং পরিবারটির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতনচেষ্টার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে কোনো নাগরিকের বাড়িঘর নিরাপদ নয়, এমন পরিস্থিতি চলতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের পরিচয় এখানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করলেও আইনগত সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের সমান। তবে যাঁদের আত্মত্যাগ ও সাক্ষ্য দেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের পরিবারকে ভয়ভীতি ও প্রতিশোধের মুখে অসহায় ফেলে রাখা আরও বেশি লজ্জাজনক।
মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল স্মৃতিচারণ, দিবস পালন কিংবা বক্তৃতার বিষয় নয়; এর প্রকৃত প্রতিফলন ঘটতে হবে নাগরিকের নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। শাল্লার এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত হোক। কোনো প্রভাবশালী মহল যেন অপরাধীদের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়াতে না পারে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের আর্তনাদ যেন প্রশাসনের দপ্তরে আটকে না থাকে। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে - এই দেশে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিচারের একমাত্র মাপকাঠি।