হাওরে প্রসূতিসেবার সংকট, চাই কার্যকর উদ্যোগ

আপলোড সময় : ২৯-১০-২০২৬ ০১:০৮:১৩ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৯-১০-২০২৬ ০১:০৮:১৩ পূর্বাহ্ন
হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে একটি প্রাণের জন্মও কখনো কখনো হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর লড়াই। গর্ভবতী নারীকে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় নৌকায় কিংবা পথের ধারে সন্তান প্রসবের ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করে। বর্ষায় মাসের পর মাস পানিবেষ্টিত থাকে হাওরের বহু জনপদ। নৌকাই তখন মানুষের চলাচলের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু জরুরি প্রসবব্যথা শুরু হলে সব সময় নৌযান পাওয়া যায় না, থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও দীর্ঘ পথ পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হয়, বাড়ে মা ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি। শাল্লার তাজপুর গ্রামের বিলকিস বেগমের নৌকায় সন্তান প্রসবের ঘটনা এই বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ। আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতির দায় শুধু দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রসবসেবাকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত ধাত্রী, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এবং জরুরি পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের আগাম শনাক্ত করা গেলে অনেক অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। এ জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও পরিবারকল্যাণকেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে। হাওরাঞ্চলের বাস্তবতায় নৌ-অ্যাম্বুলেন্স কোনো বিলাসিতা নয়, বরং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার অপরিহার্য অংশ। প্রতিটি দুর্গম এলাকায় দ্রুতগতির নৌযান, প্রশিক্ষিত চালক, জ্বালানি এবং সার্বক্ষণিক যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে কোথায় ফোন করতে হবে, কোন পথে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো যাবে - এসব তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিকূল আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অন্তঃসত্ত্বা নারীদের নিরাপদ স্থানে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। সুনামগঞ্জে ভাসমান হাসপাতাল চালুর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। উদ্যোগটি আশাব্যঞ্জক। তবে প্রস্তাব পাঠানোতেই দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। দ্রুত অনুমোদন, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। ভাসমান হাসপাতালে প্রসবের নিরাপদ ব্যবস্থা, জরুরি অস্ত্রোপচার বা জটিল রোগীকে উচ্চতর হাসপাতালে স্থানান্তরের সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক-নার্সের উপস্থিতি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে স¤পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। প্রশিক্ষিত ধাত্রীদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ, গর্ভবতী নারীদের নিবন্ধন এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। মাতৃত্ব কোনো নারীর জন্য আতঙ্কের কারণ হতে পারে না। ভৌগোলিক দুর্গমতা একজন নাগরিকের নিরাপদ প্রসবের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। হাওরের পরিবেশ ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত, টেকসই ও কার্যকর মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। কেবল আশ্বাস নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান উদ্যোগ - যাতে হাওরের কোনো মাকে আর হাসপাতাল পৌঁছানোর আগেই জীবনের ঝুঁকি নিতে না হয়।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : dailysunamkantha@gmail.com
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com