বিবাহ একটি সামাজিক ও আইনগত বন্ধন। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নারী-পুরুষের অধিকার, পারিবারিক স্থিতিশীলতা, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও উত্তরাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ বিবাহ নিবন্ধনে তথ্য গোপন, অনিয়ম, বাল্যবিবাহ ও অননুমোদিত বহুবিবাহের ঘটনা এখনো উদ্বেগের কারণ। এমন বাস্তবতায় অনলাইনে বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের মতো অনলাইনেই বিবাহ নিবন্ধন করতে হবে। এ ব্যবস্থায় বৈবাহিক তথ্য সমন্বিত ডেটাবেইসে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে কোনো ব্যক্তি আগে বিবাহ করেছেন কি না, তার কতটি বিবাহ রয়েছে এবং নতুন বিবাহের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা সহজেই যাচাই করা যাবে। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে আগের বিবাহের তথ্য গোপন করে নতুন বিবাহের অভিযোগ ওঠে। কোথাও বিবাহ অস্বীকার কিংবা নিবন্ধনের যথাযথ নথি না থাকায় নারীদের আইনি জটিলতায় পড়তে হয়। আবার বিবাহের তথ্য নিয়ে বিরোধের কারণে উত্তরাধিকার নির্ধারণেও সংকট তৈরি হয়। অনলাইন নিবন্ধনব্যবস্থা এসব অনিয়ম কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নারীর অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধেও ডিজিটাল নিবন্ধনব্যবস্থা সহায়ক হবে। জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে বিয়ের ক্ষেত্রে বয়সসংক্রান্ত অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে। একইভাবে অননুমোদিত বহুবিবাহের তথ্য গোপন করার সুযোগও কমবে। তবে শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেই চলবে না; আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। এই ব্যবস্থার আরেকটি বড় সুবিধা হলো, সরকারি বিভিন্ন সেবা ও আইনি প্রয়োজনে বৈবাহিক তথ্য দ্রুত যাচাই করা যাবে। বিদেশে যাতায়াত, উত্তরাধিকার নির্ধারণ কিংবা পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে তথ্য সংগ্রহের ভোগান্তি কমবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রের কাছে বিবাহ ও তালাকের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সংরক্ষিত থাকবে। তবে অনলাইন নিবন্ধন চালুর ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক নিকাহ রেজিস্ট্রারের প্রযুক্তিগত দক্ষতা সীমিত। কোথাও ইন্টারনেট ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতিও রয়েছে। তাই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং ভুল তথ্য সংশোধনের সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। আইনমন্ত্রীর ঘোষিত পাইলট প্রকল্পের আওতায় পাঁচ জেলার ২৭ জন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। তবে এ কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারণ করে দেশের সব নিকাহ রেজিস্ট্রারকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। বিবাহ নিবন্ধনের ডিজিটাল রূপান্তর কেবল প্রশাসনিক আধুনিকায়ন নয়, এটি নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই উদ্যোগটি যেন শুধু ঘোষণা ও প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ না থাকে। কার্যকর বাস্তবায়ন, কঠোর নজরদারি এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে অনলাইন বিবাহ নিবন্ধনব্যবস্থা দেশে বিবাহসংক্রান্ত অনিয়ম প্রতিরোধে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।