একজন আদর্শ চামচার বৈশিষ্ট্য
প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন
খোশামোদ গায়ে মেখে যে যাহার ঘরে,
খুশিতে ডগমগ মন, চোখ ফেটে পড়ে।
সাহেব বলেন, “আহা! খাসা লোক তুমি,
তোমার মতন সাধু দেখি নাই আমি।”
চাটুকার বলে হেসে, “হুজুরের দয়া,
চরণে রাখিয়া মোরে দেহ তব ছায়া।”
- সুকুমার রায়
বাংলা সাহিত্যে এবং বাংলার রাজনীতিতে তোষামোদি বা চামচামি খুবই সুপরিচিত শব্দ। প্রকাশ্যে সকলেই তোষামোদি বা চামচামি পছন্দ না করলেও তোষামোদিদে খুশি হয়না, এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। বিশেষকরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উন্নতি করতে, কাক্সিক্ষত পদ-পদবী পেতে হলে চামচামির কোন বিকল্প নেই। চামচা বলতে সাধারণত এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি, নেতা, কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ন্যায়-অন্যায় নির্বিশেষে অন্ধভাবে প্রশংসা, সমর্থন ও তোষামোদ করে। নিজের স্বাধীন বিবেচনা ও নীতিবোধের পরিবর্তে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোরঞ্জনকে বেশি গুরুত্ব দেন। নেতার ভুল সিদ্ধান্তেরও যৌক্তিকতা প্রমাণ করা, সমালোচনাকে দমন বা উপেক্ষা করা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে অতিরঞ্জিত প্রশংসা করা চামচাগিরির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। রাজনীতিতে এ ধরনের ব্যক্তিকে অনেক সময় নেতার ‘অনুগত’ বা ‘তোষামোদকারী’ হিসেবে দেখা হয়। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শে সমর্থন ও যুক্তিসঙ্গত আনুগত্যকে চামচাগিরি বলা যায় না; অন্ধ ও স্বার্থনির্ভর তোষামোদই এর মূল বৈশিষ্ট্য। একজন চামচা নিজের স্বাধীন বিবেচনা, নীতিবোধ ও যুক্তিকে পাশে সরিয়ে রেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোরঞ্জনকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ক্ষমতাবান ব্যক্তির সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুবিধা, পদ, প্রভাব কিংবা সামাজিক মর্যাদা লাভের প্রত্যাশা তার আচরণকে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে চামচাগিরি কেবল প্রশংসার একটি ধরণ নয়; এটি ব্যক্তিস্বার্থনির্ভর অন্ধ আনুগত্যের একটি আচরণগত প্রকাশ। বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে চামচামি বা তোষামোদি ক্ষেত্র বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পদ-পদবী পেতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। ক্ষমতা ও পদ-পদবীর লোভে দেশে একটি অসুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠেছে। এদের কারণে সমাজের স্বাভাবিক গতি ব্যহত হচ্ছে। আর তাই আজ তোষামোদকারী বা চামচার বৈশিষ্ট্য, ধরণ ও প্রকৃতি নিয়ে লিখতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। একজন চামচার প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অতিরঞ্জিত প্রশংসা। ক্ষমতাবান ব্যক্তির সামান্য কাজকেও তিনি অসাধারণ কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেন। সাধারণ বক্তব্যকে যুগান্তকারী বক্তব্য, স্বাভাবিক সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং সামান্য সাফল্যকে বিরাট অর্জন হিসেবে প্রচার করা তার স্বভাবের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। বাস্তব মূল্যায়নের চেয়ে প্রশংসার মাত্রাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন আদর্শ চামচার কাজই হলো নেতা বা কর্তৃপক্ষের সঠিক বা ভুল সিদ্ধান্তের পক্ষে বয়ান তৈরি করা। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য না করা। একজন নীতিবান ব্যক্তি কোনো নেতার ভালো সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার পাশাপাশি ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করতে পারেন। কিন্তু চামচা সাধারণত ব্যক্তির সঙ্গে নিজের অবস্থানকে এমনভাবে একীভূত করেন যে তার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে নিজের বিরোধিতা হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে ভুল সিদ্ধান্তকেও তিনি সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো স্বাধীন মতপ্রকাশের অভাব। চামচারা সাধারণত নিজের চিন্তা ও বিচারবোধের পরিবর্তে ক্ষমতাবান ব্যক্তির মতামতকে অনুসরণ করেন। নেতা যে কথা বলেন, তিনি তার প্রতিধ্বনি করেন; নেতা যে অবস্থান গ্রহণ করেন, তিনিও দ্রুত সেই অবস্থান গ্রহণ করেন। তার নিজস্ব মতামত থাকলেও ক্ষমতাবান ব্যক্তির অসন্তুষ্টির আশঙ্কায় তা প্রকাশ করতে চান না। চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতাবান ব্যক্তির মনোরঞ্জনের প্রবণতা। কোথায় কী বলতে হবে, কখন প্রশংসা করতে হবে এবং কোন কথায় নেতা বা কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হবে - এসব বিষয়ে চামচা অত্যন্ত সচেতন থাকেন। সভা, অনুষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ব্যক্তিগত আলাপ- সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রশংসার সুযোগ খুঁজে বেড়ান। অনেক সময় অন্যদের চেয়ে নিজেকে বেশি অনুগত প্রমাণ করার জন্য অতিরিক্ত উৎসাহ দেখান। অতি উৎসাহীদের কারণে প্রায়শই ক্ষমতাসীন দলকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। পঞ্চম বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির আকাক্সক্ষা। চামচাগিরির পেছনে সবসময় যে ব্যক্তিগত লাভ থাকবে তা নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাবান ব্যক্তির নৈকট্য থেকে সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা কাজ করে। পদ, পদোন্নতি, দায়িত্ব, সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক প্রভাব কিংবা বিশেষ মর্যাদা অর্জনের আকাক্সক্ষা তাকে তোষামোদে উৎসাহিত করতে পারে। ষষ্ঠ বৈশিষ্ট্য হলো সমালোচনা সহ্য করতে না পারা। চামচা নিজে যেমন ক্ষমতাবান ব্যক্তির সমালোচনা করতে চান না, তেমনি অন্য কেউ সমালোচনা করলে সেটিও সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। তিনি সমালোচনাকারীকে অবজ্ঞা, আক্রমণ কিংবা হেয় করার চেষ্টা করতে পারেন। এর ফলে যুক্তিনির্ভর আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয় এবং একটি কৃত্রিম প্রশংসার পরিবেশ তৈরি হয়। সপ্তম বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ। চামচা সাধারণত নীতির চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে বেশি আগ্রহী। কে ক্ষমতায় আছেন, কার প্রভাব বেশি, কার কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে - এসব বিষয় তার আচরণকে প্রভাবিত করে। ফলে ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তিত হলে তার আনুগত্যের দিকও পরিবর্তিত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অষ্টম বৈশিষ্ট্য হলো তথ্যকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা। কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য তিনি অন্যদের সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য পরিবেশন করেন, আবার নিজের পছন্দের ব্যক্তির ভুল বা ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করেন। এতে দল বা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অবিশ্বাস, বিভাজন ও অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে। নবম বৈশিষ্ট্য হলো নিজের যোগ্যতার চেয়ে সম্পর্ককে পুঁজি করা। চামচা অনেক সময় মনে করেন, দক্ষতা ও যোগ্যতার চেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। তাই নিজের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রভাবশালী ব্যক্তির মন জয় করার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। একজন চামচার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বা দশম বৈশিষ্ট্য হলো স্ববিরোধিতা। এটিকে তার মানসিক বৈকল্যও বলা যায়। প্রতিপক্ষের যে কাজ অন্যায়-অপরাধ মনে হয়, নিজ দল বা নেতা সেটি করলে চামচা তার পক্ষে যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করেন। নিজের নেতা বা কর্তৃপক্ষ একসময় যেটি সত্য বলে প্রচার করতেন, পরবতীতে ঐ ব্যক্তি তার বিপরীত অবস্থান নিলে চামচাও দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করে নেতা বা কর্তৃপক্ষের সাথে তাল মিলান। প্রতিপক্ষ নেতার যে ভুলের তিনি সমালোচনা করেন, নিজের দলের নেতার অনুরূপ কাজের তিনি প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয়, প্রতিপক্ষের কোন নেতা যদি নিজ দলে যোগ দেয়, চামচারা নানা বয়ানে তাকে মহৎ করে তোলে। আবার নিজ দলের কোন নেতা যদি প্রতিপক্ষ দলে যোগ দেয়, তাহলে তার চরিত্র হনন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। একজন আদর্শ চামচার কাছে নিজ দল ও নেতার সবকিছুই ভালো, পক্ষান্তরে প্রতিপক্ষ দল ও নেতার সবকিছুই খারাপ। চামচাদের এই স্ববিরোধিতাই সুশাসনের অন্তরায়, সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার বাধা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি - কাউকে সম্মান করা, কোনো নেতার ভালো কাজের প্রশংসা করা অথবা বৈধ সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা চামচাগিরি নয়। একজন সমর্থক বা অনুগত ব্যক্তি যুক্তি, নীতি ও বিবেকের ভিত্তিতে কাউকে সমর্থন করতে পারেন। চামচাগিরির মূল পার্থক্য হলো অন্ধ আনুগত্য, অতিরঞ্জিত তোষামোদ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ বিসর্জন দেওয়া। সুতরাং একজন চামচার প্রকৃত পরিচয় তার প্রশংসার ভাষায় যতটা নয়, তার স্বাধীন বিচারবোধের অনুপস্থিতিতে ততটাই প্রকাশ পায়। যে ব্যক্তি ক্ষমতাবান ব্যক্তির ভুলকে ভুল বলতে পারেন না, যুক্তিসঙ্গত সমালোচনাকে ভয় পান, ব্যক্তিস্বার্থে সত্যকে আড়াল করেন এবং নীতির পরিবর্তে ব্যক্তির সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেন - তার মধ্যেই চামচাগিরির প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। সুস্থ সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের জন্য তাই অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে প্রয়োজন যুক্তিবোধ, নৈতিক সাহস, স্বাধীন চিন্তা এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকার।
[লেখক- প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন, অধ্যক্ষ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ]
প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন
খোশামোদ গায়ে মেখে যে যাহার ঘরে,
খুশিতে ডগমগ মন, চোখ ফেটে পড়ে।
সাহেব বলেন, “আহা! খাসা লোক তুমি,
তোমার মতন সাধু দেখি নাই আমি।”
চাটুকার বলে হেসে, “হুজুরের দয়া,
চরণে রাখিয়া মোরে দেহ তব ছায়া।”
- সুকুমার রায়
বাংলা সাহিত্যে এবং বাংলার রাজনীতিতে তোষামোদি বা চামচামি খুবই সুপরিচিত শব্দ। প্রকাশ্যে সকলেই তোষামোদি বা চামচামি পছন্দ না করলেও তোষামোদিদে খুশি হয়না, এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। বিশেষকরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উন্নতি করতে, কাক্সিক্ষত পদ-পদবী পেতে হলে চামচামির কোন বিকল্প নেই। চামচা বলতে সাধারণত এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি, নেতা, কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ন্যায়-অন্যায় নির্বিশেষে অন্ধভাবে প্রশংসা, সমর্থন ও তোষামোদ করে। নিজের স্বাধীন বিবেচনা ও নীতিবোধের পরিবর্তে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোরঞ্জনকে বেশি গুরুত্ব দেন। নেতার ভুল সিদ্ধান্তেরও যৌক্তিকতা প্রমাণ করা, সমালোচনাকে দমন বা উপেক্ষা করা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে অতিরঞ্জিত প্রশংসা করা চামচাগিরির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। রাজনীতিতে এ ধরনের ব্যক্তিকে অনেক সময় নেতার ‘অনুগত’ বা ‘তোষামোদকারী’ হিসেবে দেখা হয়। তবে রাজনৈতিক মতাদর্শে সমর্থন ও যুক্তিসঙ্গত আনুগত্যকে চামচাগিরি বলা যায় না; অন্ধ ও স্বার্থনির্ভর তোষামোদই এর মূল বৈশিষ্ট্য। একজন চামচা নিজের স্বাধীন বিবেচনা, নীতিবোধ ও যুক্তিকে পাশে সরিয়ে রেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোরঞ্জনকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ক্ষমতাবান ব্যক্তির সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুবিধা, পদ, প্রভাব কিংবা সামাজিক মর্যাদা লাভের প্রত্যাশা তার আচরণকে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে চামচাগিরি কেবল প্রশংসার একটি ধরণ নয়; এটি ব্যক্তিস্বার্থনির্ভর অন্ধ আনুগত্যের একটি আচরণগত প্রকাশ। বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে চামচামি বা তোষামোদি ক্ষেত্র বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পদ-পদবী পেতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। ক্ষমতা ও পদ-পদবীর লোভে দেশে একটি অসুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠেছে। এদের কারণে সমাজের স্বাভাবিক গতি ব্যহত হচ্ছে। আর তাই আজ তোষামোদকারী বা চামচার বৈশিষ্ট্য, ধরণ ও প্রকৃতি নিয়ে লিখতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। একজন চামচার প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অতিরঞ্জিত প্রশংসা। ক্ষমতাবান ব্যক্তির সামান্য কাজকেও তিনি অসাধারণ কৃতিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেন। সাধারণ বক্তব্যকে যুগান্তকারী বক্তব্য, স্বাভাবিক সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং সামান্য সাফল্যকে বিরাট অর্জন হিসেবে প্রচার করা তার স্বভাবের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। বাস্তব মূল্যায়নের চেয়ে প্রশংসার মাত্রাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন আদর্শ চামচার কাজই হলো নেতা বা কর্তৃপক্ষের সঠিক বা ভুল সিদ্ধান্তের পক্ষে বয়ান তৈরি করা। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য না করা। একজন নীতিবান ব্যক্তি কোনো নেতার ভালো সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার পাশাপাশি ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করতে পারেন। কিন্তু চামচা সাধারণত ব্যক্তির সঙ্গে নিজের অবস্থানকে এমনভাবে একীভূত করেন যে তার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে নিজের বিরোধিতা হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে ভুল সিদ্ধান্তকেও তিনি সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো স্বাধীন মতপ্রকাশের অভাব। চামচারা সাধারণত নিজের চিন্তা ও বিচারবোধের পরিবর্তে ক্ষমতাবান ব্যক্তির মতামতকে অনুসরণ করেন। নেতা যে কথা বলেন, তিনি তার প্রতিধ্বনি করেন; নেতা যে অবস্থান গ্রহণ করেন, তিনিও দ্রুত সেই অবস্থান গ্রহণ করেন। তার নিজস্ব মতামত থাকলেও ক্ষমতাবান ব্যক্তির অসন্তুষ্টির আশঙ্কায় তা প্রকাশ করতে চান না। চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতাবান ব্যক্তির মনোরঞ্জনের প্রবণতা। কোথায় কী বলতে হবে, কখন প্রশংসা করতে হবে এবং কোন কথায় নেতা বা কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হবে - এসব বিষয়ে চামচা অত্যন্ত সচেতন থাকেন। সভা, অনুষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ব্যক্তিগত আলাপ- সব ক্ষেত্রেই তিনি প্রশংসার সুযোগ খুঁজে বেড়ান। অনেক সময় অন্যদের চেয়ে নিজেকে বেশি অনুগত প্রমাণ করার জন্য অতিরিক্ত উৎসাহ দেখান। অতি উৎসাহীদের কারণে প্রায়শই ক্ষমতাসীন দলকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। পঞ্চম বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির আকাক্সক্ষা। চামচাগিরির পেছনে সবসময় যে ব্যক্তিগত লাভ থাকবে তা নয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাবান ব্যক্তির নৈকট্য থেকে সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা কাজ করে। পদ, পদোন্নতি, দায়িত্ব, সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক প্রভাব কিংবা বিশেষ মর্যাদা অর্জনের আকাক্সক্ষা তাকে তোষামোদে উৎসাহিত করতে পারে। ষষ্ঠ বৈশিষ্ট্য হলো সমালোচনা সহ্য করতে না পারা। চামচা নিজে যেমন ক্ষমতাবান ব্যক্তির সমালোচনা করতে চান না, তেমনি অন্য কেউ সমালোচনা করলে সেটিও সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। তিনি সমালোচনাকারীকে অবজ্ঞা, আক্রমণ কিংবা হেয় করার চেষ্টা করতে পারেন। এর ফলে যুক্তিনির্ভর আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয় এবং একটি কৃত্রিম প্রশংসার পরিবেশ তৈরি হয়। সপ্তম বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ। চামচা সাধারণত নীতির চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে বেশি আগ্রহী। কে ক্ষমতায় আছেন, কার প্রভাব বেশি, কার কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে - এসব বিষয় তার আচরণকে প্রভাবিত করে। ফলে ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তিত হলে তার আনুগত্যের দিকও পরিবর্তিত হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অষ্টম বৈশিষ্ট্য হলো তথ্যকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা। কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য তিনি অন্যদের সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য পরিবেশন করেন, আবার নিজের পছন্দের ব্যক্তির ভুল বা ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করেন। এতে দল বা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অবিশ্বাস, বিভাজন ও অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে। নবম বৈশিষ্ট্য হলো নিজের যোগ্যতার চেয়ে সম্পর্ককে পুঁজি করা। চামচা অনেক সময় মনে করেন, দক্ষতা ও যোগ্যতার চেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। তাই নিজের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রভাবশালী ব্যক্তির মন জয় করার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। একজন চামচার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বা দশম বৈশিষ্ট্য হলো স্ববিরোধিতা। এটিকে তার মানসিক বৈকল্যও বলা যায়। প্রতিপক্ষের যে কাজ অন্যায়-অপরাধ মনে হয়, নিজ দল বা নেতা সেটি করলে চামচা তার পক্ষে যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করেন। নিজের নেতা বা কর্তৃপক্ষ একসময় যেটি সত্য বলে প্রচার করতেন, পরবতীতে ঐ ব্যক্তি তার বিপরীত অবস্থান নিলে চামচাও দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করে নেতা বা কর্তৃপক্ষের সাথে তাল মিলান। প্রতিপক্ষ নেতার যে ভুলের তিনি সমালোচনা করেন, নিজের দলের নেতার অনুরূপ কাজের তিনি প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয়, প্রতিপক্ষের কোন নেতা যদি নিজ দলে যোগ দেয়, চামচারা নানা বয়ানে তাকে মহৎ করে তোলে। আবার নিজ দলের কোন নেতা যদি প্রতিপক্ষ দলে যোগ দেয়, তাহলে তার চরিত্র হনন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। একজন আদর্শ চামচার কাছে নিজ দল ও নেতার সবকিছুই ভালো, পক্ষান্তরে প্রতিপক্ষ দল ও নেতার সবকিছুই খারাপ। চামচাদের এই স্ববিরোধিতাই সুশাসনের অন্তরায়, সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার বাধা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি - কাউকে সম্মান করা, কোনো নেতার ভালো কাজের প্রশংসা করা অথবা বৈধ সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা চামচাগিরি নয়। একজন সমর্থক বা অনুগত ব্যক্তি যুক্তি, নীতি ও বিবেকের ভিত্তিতে কাউকে সমর্থন করতে পারেন। চামচাগিরির মূল পার্থক্য হলো অন্ধ আনুগত্য, অতিরঞ্জিত তোষামোদ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে ন্যায়-অন্যায়ের বিচারবোধ বিসর্জন দেওয়া। সুতরাং একজন চামচার প্রকৃত পরিচয় তার প্রশংসার ভাষায় যতটা নয়, তার স্বাধীন বিচারবোধের অনুপস্থিতিতে ততটাই প্রকাশ পায়। যে ব্যক্তি ক্ষমতাবান ব্যক্তির ভুলকে ভুল বলতে পারেন না, যুক্তিসঙ্গত সমালোচনাকে ভয় পান, ব্যক্তিস্বার্থে সত্যকে আড়াল করেন এবং নীতির পরিবর্তে ব্যক্তির সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেন - তার মধ্যেই চামচাগিরির প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। সুস্থ সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের জন্য তাই অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে প্রয়োজন যুক্তিবোধ, নৈতিক সাহস, স্বাধীন চিন্তা এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকার।
[লেখক- প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন, অধ্যক্ষ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, সুনামগঞ্জ]