হাওরে গোখাদ্য সংকট, গবাদি পশু বাঁচাতে জলাবন ‘এড়াইল’ ভরসা কৃষকের

আপলোড সময় : ০২-১০-২০২৬ ০৯:২৭:১৪ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০২-১০-২০২৬ ০৯:৩২:৪০ পূর্বাহ্ন
বিশ্বজিত রায়, হাওর থেকে ফিরে::
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে গেছে গেল বোরো মৌসুম। টেনেটুনে কোনরকম বছরের খোরাক জোগাড় করতে পারলেও গবাদি পশুর জন্য প্রয়োজনীয় খড় তুলতে পারেনি কৃষক। গোখাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় জলাবন ও কচুরিপানা কেটে গৃহপালিত পশু বাঁচানোর চেষ্টা করছেন হাওর এলাকার মানুষেরা।
হাওর নিয়ে কাজ করা লোকজন ও কৃষকের ভাষ্য, খাদ্য উদ্বৃত্তের জেলা হিসেবে এ হাওরাঞ্চলের আলাদা পরিচিতি আছে। বোরো আবাদের সাথে গবাদি পশুপালন এখানকার মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস। অনুকূল পরিবেশে ফলন ঘরে তুলতে পারলে বছরের খোরাক, খরচ ও গোখাদ্য তিনটিরই সংস্থান হয় তাদের। এর ব্যতিক্রম হলে গোখাদ্যের সংকট সামাল দেওয়া কৃষকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জে গবাদি পশু আছে ৬ লক্ষ ১০ হাজার ৯৯০টি। এর মধ্যে গরু ৫ লক্ষ ৪০ হাজার, মহিষ ২১ হাজার ১০০ ও ছাগল আছে ৪৯ হাজার ৮৯০টি। গেল বোরো মৌসুমে আগাম বন্যায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় খড় উৎপাদন আশানরূপ হয়নি। যে কারণে জেলায় গোখাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে ছোট-বড় ১৯৩টি হাওর ও বিলের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। জেলায় প্রায় পৌনে ৪ লাখ বোরো চাষীর মধ্যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অধিকাংশ কৃষকের। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সবার বাড়িতে কমবেশি গবাদি পশু আছে। এক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর হাওরে প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ টন খড় উৎপাদন হয়। এর বাজার মূল্য প্রায় ১২০ কোটি টাকা।
তাহিরপুরের সুলেমানপুর গ্রামের কৃষক ও মহালিয়া হাওর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মো. সিরাজুল হক বলেন, ফলনমরা বছর হওয়ায় বেশির ভাগ মানুষ খেড় ঘরে তুলতে পারছে না। গোখাদ্যের অভাবে প্রতিটা গিরস্থ দুইটা-তিনটা কইরা গরু বিক্রি কইরা দিছে। যে কয়টা আছে এইটিরে এড়াইল বন খাওয়াইয়া একবায় একবায় জীবন রক্ষা করতাছে। গোখাদ্যের সংকট মোকাবেলায় সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সবাই শনির হাওরের এড়াইল বন (জলাবন) কাইট্যা গরুরে খাওয়াইতাছে। এই কয়টা গ্রামের শতাধিক কৃষকের ভরসা এড়াইল বন। এছাড়া গরু পালনের কোন পথ নাই। শনিবার সকালে নৌকাযোগে শনি হাওর ঘুরে দেখা যায়, থইথই পানিতে স্থির ভাসছে বিশেষ এ জলাবনের (স্থানীয় ভাষায় বলে এড়াইল বন) সৌন্দর্য্য। দূর থেকে মনে হয় আবাদকৃত ধানী জমি। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অনেকে ভাসমান এ জলাবন কেটে নৌকায় তুলছেন।
তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জসহ তিন উপজেলা নিয়ে শনি হাওরের বিস্তৃতি। প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রামের কৃষক এই হাওরে আসে জলাবন (এড়াইল) কাটতে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে জলাবন সংগ্রহকারীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে বলছেন বন কাটতে আসা লোকজন। টইটম্বুর হাওরের মাঝ বরাবর নৌকায় করে জলাবন (এড়াইল বন) কাটছিলেন নূর ইসলাম, মুকুল রায় ও আলী নূরসহ কয়েকজন। তাদের প্রত্যেকের ৪-৫টি করে গরু আছে। গোখাদ্য না থাকায় গরু বাঁচানোর জন্য হাওরের জলাবন তাদের একমাত্র সম্বল।
শনি হাওরে এড়াইল বন কাটার উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, বছর গেছে খারাপ। খেড় পাইছি না। হাওরের এড়াইল বন গরুর জান বাঁচাইছে। তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুরসহ সব জায়গার শত শত মানুষ আইয়া এই বন কাটে। এড়াইল বন খেড়ের অভাব পূরণ করছে।
জলাবনের উপকারিতা ও বেড়ে ওঠা নিয়ে মুকুল রায় জানিয়েছেন, এড়াইল বন একটি বিশেষ জলজ উদ্ভিদ। এই বন এ পর্যন্ত অন্তত চার-পাঁচবার কাটা হয়েছে। প্রথমে গাঢ় সবুজ ছিল। কাটতে কাটতে কিছুটা হলুদ বর্ণ হয়েছে। স্যালাইনের নলাকৃতির এ বন পানি বাড়ার সাথে সাথে লম্বা হতে থাকে। গরু-বাছুর এ বন খড়ের মতো খায়। তেমন কোন সমস্যা হয় না।
তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শাহগঞ্জ গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম। তিনি ১৪ কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। অর্ধেক জমির ধান কোনরকম কেটে খোরাক তুলতে পারলেও খড় পেয়েছেন যৎসামান্য। তাঁর তিনটি মহিষ আছে।

গৃহপালিত পশু পালনের উপায় জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, খড়ের অভাবে মহিষগুলো চার মাস আগে নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা এক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম। কিছুদিন আগে বাড়িতে নিয়ে আসি। পানি শুকিয়ে যাওয়ায় হাওরে ছেড়ে দেই। কচুরিপানা ও বন খেয়ে মহিষগুলো বেঁচে আছে।

জামালগঞ্জের বেহেলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সামন্ত সরকার বলেন, আমার বাড়িতেও এড়াইল বন আছে। আমি নিজেও এ বন কাটতে যাই। গোখাদ্য সংকটে বাধ্য হয়ে গবাদি পশুকে এড়াইল বন খাওয়াতে হচ্ছে। ফলন বিপর্যয়ের কারণে আগামীতেও এমনটা হতে পারে। কৃষকের কথা চিন্তা করে গোখাদ্য সহায়তার বিষয়টি ভাবা দরকার।
সুনামগঞ্জ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মিজানুর রহমান মিয়া বলেন, জেলায় প্রায় ৬ লাখের বেশি গবাদিপশু আছে। এই পশুপালনে জেলায় পর্যাপ্ত গোখাদ্য সংকট আছে। আগাম বন্যায় সব নষ্ট হওয়ায় খড়ও নষ্ট হয়ে গেছে। সঙ্কটের সময় প্রস্তাব দেওয়া হয়। গোখাদ্য কিনতে বরাদ্দ যা আসে তা যৎসামান্য।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : dailysunamkantha@gmail.com
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com