শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা যখন শিক্ষার পথে প্রতিনিয়ত বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সবার জন্য একই শিক্ষা-ব্যবস্থা কার্যকর থাকে না। সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র তারই বাস্তব উদাহরণ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষকস্বল্পতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, মৌসুমি ঝরে পড়া, বাল্যবিয়ে এবং প্রযুক্তিগত সুবিধার ঘাটতি - সব মিলিয়ে হাওরের শিক্ষার্থীরা দেশের অন্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের তুলনায় একাধিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করছে।
গত রবিবার সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ এবং সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ আয়োজিত ‘হাওরাঞ্চলে শিক্ষার সংকট ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে হাওরের বাস্তবতা বিবেচনায় পৃথক শিক্ষা ক্যালেন্ডার প্রণয়নের যে প্রস্তাব এসেছে, তা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। এটি কেবল একটি নতুন ক্যালেন্ডারের প্রস্তাব নয়; বরং হাওরের শিক্ষাব্যবস্থাকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।
হাওরে বর্ষাকালে অনেক জনপদ পানিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যেতে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। আবার বোরো ধান কাটার মৌসুমে কৃষক পরিবারের সন্তানদের একটি অংশ পরিবারের শ্রমে যুক্ত হয়। মৎস্যনির্ভর পরিবারেও মাছ ধরার মৌসুমে একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে প্রচলিত শিক্ষা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে হাওরের জীবন-জীবিকার সময়সূচির সংঘাত তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বাস্তবতা যদি হয় ভিন্ন, তাহলে শিক্ষা পরিকল্পনাও হতে হবে বাস্তবতানির্ভর।
তবে পৃথক শিক্ষা ক্যালেন্ডারই সব সমস্যার সমাধান নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন নিরাপদ ও সহজ যাতায়াতব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধা, শিক্ষক আবাসন এবং দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা। পাশাপাশি বন্যা সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা হাওরের দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
হাওরের শিক্ষার্থীদের শুধু সাধারণ শিক্ষায় সীমাবদ্ধ রাখাও ঠিক হবে না। কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ হাওরের অর্থনীতি ও সম্ভাবনার সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করা গেলে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের পথও বিস্তৃত হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হাওরের শিক্ষা সংকটকে মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। তাই প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং নিয়মিত নজরদারি। সেমিনারে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো যদি কেবল আলোচনা সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে পৌঁছায়, তবেই এর সুফল মিলবে।
হাওরের শিশুরাও সমান স্বপ্ন দেখে। তাদের স্বপ্ন যেন ভৌগোলিক প্রতিকূলতায় আটকে না যায় - এ দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের। হাওরের বাস্তবতায় উপযোগী শিক্ষা ক্যালেন্ডারসহ সমন্বিত ও টেকসই শিক্ষা পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।