লিখতে বসলেই আসে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা। প্রশাসন ঠিকঠাক চলছে কি-না তা বুঝার অন্যান্য অনেক উপায়ের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি হচ্ছে অন্যতম। দেশে চাঁদাবাজি, খুন-খারাবি আগের মতোই চলছে। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুরের মাছুয়াপাড়ার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, স্ত্রী ও ২ সন্তানসহ খুন হয়েছেন নিজগৃহে। নিরীহ নিরপরাধ এই পরিবারটিই শুধু নয়, সারাদেশে এরকম অনেক খুনের ঘটনা ঘটছে। এর জবাব দেবে কে? দেশের মানুষ এখন কোথায় নিরাপদ? রাস্তাঘাটে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বা নিজগৃহে কোথাও নিরাপদ নয়।
সরকার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ মাঝে মাঝে উদ্বিগ্ন হন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে বলেন, “অভিযান চলছে।” এমন কথা ইতোপূর্বে আমরা প্রচুর শুনেছি। ভেবেছিলাম দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। জুলাই/২৪ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে একটি অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। ড. ইউনূসের অধীনে একটি অন্তর্বর্তী সরকারও আমরা দেখেছি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও দেখেছি। দেশের মানুষ দীর্ঘ আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু কি হলো? দেশে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। ভেবেছিলাম নির্বাচিত সরকার তার সমস্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি? রংপুরে গণপতি চক্রবর্তীর কি দোষ ছিল? তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী, ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর কি দোষ ছিল? তাদের স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার গ্যারান্টি কি ছিল না?
এই সেদিন বগুড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক প্রধান শিক্ষিকা চক্ষু দেখাতে এসেছিলেন ঢাকায়। ভোরে জাতীয় সংসদ এলাকায় ছিনতাইকারীর আঘাতে প্রাণ হারান তিনি। এরকম শত শত ঘটনা ঘটছে। সংবাদপত্রের পাতায় আর কয়টি ঘটনা সংবাদ প্রকাশ পায়? ঘটনার আড়ালেই থেকে যায় সব।
মনে পড়ছে ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে ঢাকার যাত্রাবাড়িতে চিকিৎসক শামছুন্নাহার দিনে দুপুরে ছিনতাইয়ের শিকার হন। ঢাকার যাত্রাবাড়ি থানা বিগত ১৯ মাসে শুধু ছিনতাই মামলা হয় ১১৯টি। ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হয় ৩ জন এবং পুলিশ গ্রেফতার করে ১,১৫১জনকে। শুধু ছিনতাইয়ের কথা কেন আলোচনায় আসছে? সরকারি দলের অনেক নেতার বিতর্কিত কর্মকা-ের কথা কে বলবে? সন্ত্রাস পূর্বের সরকারের সময়ও ছিল। নারায়ণগঞ্জের আ.লীগের এক নেতা ছিলেন সন্ত্রাসের গডফাদার। প্রকাশ্যে দম্ভ করে মানুষের সামনে নিজের বীরত্বের কথা বলতেন। পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো, টু শব্দটিও করতো না। কিন্তু এখন আমরা এমন ঘটনাই দেখছি।
শরীয়তপুরের ৩ সাংবাদিককে মারধর করে আহত করার অভিযোগ ওঠেছে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। তিনি শরীয়তপুর জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোস্তাক। ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাহিদ হাসান, নিউজ২৪ ও জাগো নিউজ প্রতিনিধি বিধান মজুমদার এবং দৈনিক মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লা পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তাদের মারধর করে বিএনপি নেতা আরিফুজ্জামান মোস্তাক। পরবর্তীতে অপর সাংবাদিকগণ এ বিষয়ে চানতে চাইলে ওই নেতা দম্ভ করে বলেন- “তোমরা লেখবা আমরা পিডামু”। এই নেতা কেমন সাহস পেলে এমন দম্ভোক্তি করতে পারে। দেশে তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে কেমন করে?
আমরা কথায় কথায় আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের উদাহরণ দেই। কিন্তু এখনতো নির্বাচিত সরকার দেশে। এদেশে সাধারণ মানুষ তাহলে বসবাস করবে কিভাবে? সাংবাদিকরা যদি সাহস করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে না পারে, অন্যায়ের সংবাদ পত্রিকায় ছাপাতে না পারে, তাহলে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কেমন করে?
আমরা দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। ক্ষমতার লোভ আমাদের নেই। আমরা সারাদিন কাজকর্ম করে দিনের শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরতে চাই। অর্থকড়ি নিয়ে নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে চাই। মোটকথা জীবনের স্বাভাবিক গ্যারান্টি চাই। এমন গ্যারান্টির নিশ্চয়তা দিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এখন তারা যদি সেই ওয়াদার কথা বেমালুম ভুলে যায় তাহলে তাদেরকে অবশ্যই একদিন দাঁড়াতে হবে জনতার কাঠগড়ায়। নিকট অতীতে আমাদের সামনে এমন উদাহরণ তো রয়েই গেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর দেশ শাসন করে পার পায়নি আওয়ামী লীগ সরকার। এখন তারা নির্বাসিত, দেশের বাইরে।