::শেরগুল আহমেদ::
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর কেটে গেছে দীর্ঘ আটটি দশক। এই আশি বছরে পৃথিবীর মানচিত্র বদলেছে, উপনিবেশবাদের অবসান ঘটেছে, এবং বিশ্বমঞ্চে উদয় হয়েছে নতুন নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির। কিন্তু বদলায়নি জাতিসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর অঙ্গ নিরাপত্তা পরিষদের মূল কাঠামো। আটটি দশক পেরিয়েও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং অন্যতম জনবহুল মহাদেশ আফ্রিকা এখনও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ থেকে বঞ্চিত। এই ঐতিহাসিক অবিচার এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের শুরুতেই এক বজ্রকণ্ঠ শোনা গেছে। অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট ও কড়া ভাষায় বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, “আফ্রিকাকে টেবিল (আলোচনার টেবিল)-এ থাকতে হবে, মেন্যুর খাদ্য হিসেবে নয়।” তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, আফ্রিকাকে তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য আর অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষায় রাখা যায় না। এটি কেবল কোনো আঞ্চলিক দাবি নয়, বরং জাতিসংঘের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতা, বিচার এবং গ্রহণযোগ্যতা টিকিয়ে রাখার লড়াই। যেখানে তিনি আফ্রিকার দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার তাগিদ দিয়েছেন। বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘের মোট সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ৫৪টি দেশই আফ্রিকার। অর্থাৎ, সাধারণ পরিষদের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি সদস্য এই মহাদেশের। অথচ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় যেখানে মূল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়, সেই নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্যের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন) মধ্যে আফ্রিকার কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।
নিরাপত্তা পরিষদে নেওয়া সিংহভাগ সিদ্ধান্ত বা শান্তি রক্ষা মিশন যেখানে আফ্রিকান অঞ্চলের ওপর প্রভাব ফেলে, সেখানে আফ্রিকার দেশগুলো কেবলই নিষ্ক্রিয় দর্শক। এই বৈপরীত্যকে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো সাধারণ পরিষদে দাঁড়িয়ে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন- জাতিসংঘের “সার্বভৌম সমতা”র ধারণাটি নিরাপত্তা পরিষদের দরজায় এসে থমকে যায়, কারণ সেখানে মাত্র পাঁচটি দেশ ভেটো ক্ষমতা নিয়ে পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আফ্রিকার এই কম-প্রতিনিধিত্বের সংকট (টহফবৎৎবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ) কেবল রাজনৈতিক আসনের অভাব নয়; এটি মূলত এক ধরনের কাঠামোগত বর্ণবাদ ও বৈষম্য, যা ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতাকে টিকিয়ে রাখছে। আফ্রিকান ইউনিয়ন (অট) দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি খুব সাধারণ- আফ্রিকাকে ভেটো ক্ষমতাসহ অন্তত দুটি স্থায়ী আসন এবং পাঁচটি অস্থায়ী আসন দিতে হবে। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ক্ষমতা ধরে রাখার মানসিকতার কারণে বছরের পর বছর এই দাবিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ পরিষদের সভাপতির এই অবস্থান অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সাহসী। ইউক্রেন, গাজা কিংবা সুদানের মতো বৈশ্বিক সংকটগুলো যখন বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের চরম ব্যর্থতা ও একপেশে নীতিকে উন্মোচিত করে দিচ্ছে, তখন এই ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া জাতিসংঘের আর কোনো বিকল্প নেই। যদি জাতিসংঘ সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈশ্বিক সংস্থা হিসেবে নিজের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে চায়, তবে আফ্রিকাকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের ভাষায়- আফ্রিকাকে চিরকাল সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা আর সম্ভব নয়। বিশ্বব্যবস্থায় সমতা আনতে হলে এবং জাতিসংঘকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী করতে হলে আফ্রিকাকে তার প্রাপ্য সম্মান ও স্থায়ী আসন দিতেই হবে। অন্যথায়, এই বিশ্ব সংস্থাটি একদিন কেবল পরাশক্তিদের ক্লাব হিসেবেই রয়ে যাবে, আর সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি হারাবে।
[২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬খ্রি.]