ছাতকে অনুমোদনহীন দুই শতাধিক চুনের কারখানা - বিষয়টি শুধু আইন ভঙ্গের নয়, এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুতর উদ্বেগের। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই বছরের পর বছর এসব কারখানায় চুন উৎপাদন চলার অভিযোগ উঠেছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, চুনাপাথর পোড়াতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে বনজ সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ধোঁয়া ও ছাইয়ে দূষিত হচ্ছে জনবসতি, সড়ক ও কৃষিজমি।
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, একটি পাজুতে এক দফায় প্রায় ৭৫ টন চুনাপাথর পোড়াতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মণ কাঠ প্রয়োজন হয়। মাসে দুই দফা উৎপাদন হলে একটি কারখানাতেই কী পরিমাণ কাঠ পুড়ছে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। দুই শতাধিক কারখানার ক্ষেত্রে এই পরিমাণ যে ভয়াবহ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে গত এক বছরে নতুন করে শতাধিক পাজু গড়ে ওঠার অভিযোগ প্রশাসনের নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব কারখানার অনেকগুলো বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি। ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে শিশু ও বয়স্কদের চোখে জ্বালাপোড়া, শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির অভিযোগ রয়েছে। অথচ ছাড়পত্রহীন কারখানা বছরের পর বছর কীভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। পরিবেশ অধিদপ্তর নিজেই যখন বলছে এসব কারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, তখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর এতদিনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি।
চুনশিল্প ছাতকের অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত - এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু কর্মসংস্থান ও ব্যবসার দোহাই দিয়ে পরিবেশ আইন উপেক্ষা করা যায় না। শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে সেটিকে পরিবেশসম্মত, নিরাপদ ও অনুমোদিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে হবে। নির্বিচারে কাঠ পোড়ানোর পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েকটি কারখানা বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারা অনুমোদনহীন কারখানা স্থাপনের সুযোগ দিচ্ছে, কারা জ্বালানি কাঠ সরবরাহ করছে এবং দীর্ঘদিন ধরে কারা এসব কার্যক্রম দেখেও না দেখার ভান করছে - সেসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা যাচাই করা জরুরি।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এখন প্রয়োজন কথার বাস্তবায়ন। ছাড়পত্রহীন কারখানার তালিকা তৈরি, অবৈধ স্থাপনা বন্ধ, জ্বালানি কাঠ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশসম্মত প্রযুক্তিতে শিল্প স্থানান্তরের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ ও পরিবেশবান্ধব চুনশিল্পকে উৎসাহ দিতে হবে।
ছাতকের চুনশিল্প মানুষের জীবিকার অংশ হতে পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই মানুষের জীবন ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে না। উন্নয়ন ও জীবিকার সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করাই হওয়া উচিত প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।