কৃষকের স্বার্থে সরকার বিপুল অর্থ ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করছে। অথচ সেই ভর্তুকির সার যদি গুদাম থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বের হয়ে পাচার হয়, আর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তদন্তের পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- কৃষকের জন্য বরাদ্দ এই সার আসলে কার স্বার্থে?
সুনামগঞ্জে সার পাচারের অভিযোগটি নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অস্তিত্বের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিএডিসি’র গুদাম থেকে এক ডিলারের মাধ্যমে ১৮ জন ডিলারের সার নিয়মবহির্ভূতভাবে উত্তোলনের ঘটনা, পরে চালান আটকের বিষয়টি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের দুর্বলতাই সামনে আনে। আরও উদ্বেগের বিষয়, এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশের পরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না হওয়া।
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে। গুদামে সার মজুদ না রেখেই ‘এরাইভাল রিপোর্ট’ দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু দায়িত্বে অবহেলা নয়, বরং সরকারি ভর্তুকির অর্থ ও কৃষকের অধিকারকে বিপন্ন করার শামিল। এ ধরনের অনিয়মের কারণে যদি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েই বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে অনিয়মকারীরা আরও উৎসাহিত হবে।
সুনামগঞ্জের কৃষকরা এমনিতেই হাওরভিত্তিক কৃষির নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করেন। বন্যা, অকালবন্যা, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরের চাপের মধ্যে তাদের যদি ভর্তুকির সারও ন্যায্যমূল্যে না মেলে, তাহলে কৃষকের ওপর দ্বিগুণ বোঝা চাপবে। সরকারি গুদাম থেকে পাচার হয়ে যাওয়া সার শেষ পর্যন্ত কৃষকের কাছেই বেশি দামে ফিরে আসে - এ অভিযোগ তাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সরকারি হিসাবে জেলায় বিএডিসি ও বিসিআইসির ১৪৮ জন ডিলার থাকলেও হাতেগোনা কয়েকজনের অনিয়মের কারণে পুরো ডিলার ব্যবস্থার ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। শুধু ডিলার নয়, গুদাম কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট শ্রমিক, পরিবহনকারী এবং কোনো কর্মকর্তা সহযোগিতা করে থাকলে তাদেরও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
ভর্তুকির সার কৃষকের অধিকার। এই অধিকার কোনো সিন্ডিকেট, ডিলার বা অসাধু কর্মকর্তার হাতে জিম্মি হতে পারে না। তাই কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সার বিতরণ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা। তদন্তের নামে ফাইল যেন আর চাপা না পড়ে - কৃষকের স্বার্থে এবার দৃশ্যমান জবাবদিহিই সবচেয়ে জরুরি।