আমাদের গুণীজন

অধ্যাপক ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস সরলতার ভুবনে সজ্জন মানুষ

আপলোড সময় : ১৩-০৯-২০২৬ ০৯:৪৬:৫৭ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৩-০৯-২০২৬ ০৯:৫৪:১১ পূর্বাহ্ন
:: আকরাম উদ্দিন ::
সুনামগঞ্জের শিক্ষাঙ্গন ও সামাজিক পরিম-লে ‘অধ্যাপক ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস’ শ্রদ্ধেয় নাম। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন, নৈতিক মূল্যবোধ, বিনয়ী আচরণ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তিনি অর্জন করেছেন মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান। তাঁর জীবন যেন শিক্ষা, মানবিকতা, নীতি ও সেবার এক দীর্ঘ পথচলার গল্প। 
তাঁর চার শব্দের নামটি অনেকের কাছেই উচ্চারণ কিংবা মনে রাখা কিছুটা কঠিন। কিন্তু নামের এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যই যেন তাঁকে দিয়েছে আলাদা এক পরিচয়। সুনামগঞ্জের পরিমন্ডলে প্রায় আট দশক ধরে এই স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ নামটি ছড়িয়ে আছে পরিচিতি ও আলোড়নের এক নিজস্ব গল্প।
নামটির সংক্ষেপ উচ্চারণ করে কেউ বলেন ‘ফেয়ারক্রস স্যার’, কেউবা ‘ন্যাথানায়েল স্যার’। কিন্তু নামের প্রতিটি অংশের রয়েছে নিজস্ব অর্থ ও তাৎপর্য। ‘ন্যাথানায়েল’ হিব্রু ভাষা থেকে উদ্ভূত একটি বাইবেলীয় নাম, যার অর্থ ‘ঈশ্বরের উপহার’। ‘এডউইন’ প্রাচীন ইংরেজি বা অ্যাংলো-স্যাক্সন উৎসের নাম, এর অর্থ ‘ভাগ্যবান বন্ধু’। আর ‘ফেয়ারক্রস’ একটি ইংরেজি বংশগত পদবি, ‘ফেয়ার’ অর্থ সুন্দর বা পরিচ্ছন্ন এবং ‘ক্রস’ অর্থ ক্রুশ। নামটির মধ্যে যেন উপহার, বন্ধুত্ব, সৌন্দর্য ও পবিত্রতার একটি প্রতীকী ভাব নিহিত রয়েছে।
সাক্ষাতের এক শান্ত সকাল: প্রায় এক মাস আগে অধ্যাপক ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে কথা বলার আগ্রহের কথা জানাই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তিনি সম্প্রতি এক সকালে দেড় ঘণ্টা সময় দিলেন। এর আগের দিন দুপুরে মোবাইল ফোনে কথা বলে নির্ধারিত সময়ে হাজির হলাম সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছননগর আবাসিক এলাকার উপত্যকা-৭২ নম্বর বাসায়। বাড়িটি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।
শান্ত, নিরিবিলি ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশে শুরু হলো আমাদের কথোপকথন। সরলতার ভুবনে অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, সজ্জন মানুষ অধ্যাপক ফেয়ারক্রস। কথার ফাঁকে তাঁর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা উঠে আসে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ভালো মানুষের প্রতি অনেক সময় ভালো আচরণের পরিবর্তে নেতিবাচক আচরণই সামনে আসে। বর্তমান সময়ে ভালো মানুষকে সবাই সহজভাবে গ্রহণ করেন না বরং নানা কারণে তাঁদের পেছনে লেগে থাকার প্রবণতাও দেখা যায়। একই সঙ্গে ভালো কাজ ও ভালো মানুষকে মূল্যায়ন করার মতো মানুষের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
নিজের জীবন নিয়ে তাঁর উপলব্ধি অত্যন্ত সরল, সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণœ রেখে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত চলতে চান। তাঁর কথায় ফুটে ওঠে একজন বিনয়ী মানুষের আত্মমর্যাদা, জীবনবোধ ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি আস্থা।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়: অধ্যাপক ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস ১৯৫১ সালের ১৩ নভেম্বর সুনামগঞ্জ পৌর শহরের পৈতৃক নিবাসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা স্বর্গীয় ক্ষিতীশ চন্দ্র দাশ এবং মাতা স্বর্গীয় সুপ্রভা দাশ। ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রসের ছিল তিন ভাই ও দুই বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তাঁর বড় ভাই তিমথী আর্থার ফেয়ারক্রস বিএসসি (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) ডিগ্রিধারী একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। দ্বিতীয় ভাই শিমিয়োন আর্থার ফেয়ারক্রস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর দুই ভাইই ইতোমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন। দুই বোনের মধ্যে বড় বোন রেবেকা সুপ্রিয়া সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনিও প্রয়াত হয়েছেন। ছোট বোন সুশান্না চৌধুরী সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ার ক্রস ১৯৮৬ সালে ঢাকার মগবাজার চার্চে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রীর নাম মিসেস গ্রেস ফেয়ারক্রস। সংসার জীবনে স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। মেয়ে ডেবোরা নাওমী ফেয়ারক্রস। তিনি সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স স¤পন্ন করেছেন। ছেলে লেহেমিয়া আর্নেস্ট ফেয়ারক্রস। তিনি রাজধানী ঢাকার ইউনিভার্সিটি ডেন্টাল কলেজ থেকে বিডিএস (ডেন্টাল সার্জেন্ট) কোর্স স¤পন্ন করেছেন।বাল্যকাল ও শিক্ষাজীবন: ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রসের শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় ১৯৫৬ সালে রাজগোবিন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে ভর্তি হন সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৬৬ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
এরপর ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সরকারি বাণিজ্য কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি.কম ডিগ্রিতে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

শৈশবের স্মৃতি আজও তাঁর মনে উজ্জ্বল। রাজগোবিন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় সহপাঠীদের সঙ্গে তাঁর ছিল আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নিতেন। সেই সময়ের জীবনে লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষের চেয়ে আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সে সময়ের শিক্ষকদের আদর্শ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও মূল্যবোধ তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বর্তমান সময়ের শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েও তাঁর রয়েছে নিজস্ব উপলব্ধি। তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এলেও নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ যেন অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে, এমনটাই মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, যুগোপযোগী শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিক গুণাবলির বিকাশে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষকতা জীবনের শুরু: শিক্ষাজীবন শেষ করে প্রফেসর ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস কর্মজীবনে প্রবেশ করেন ১৯৮০ সালের ১ মার্চ। ওই দিন তিনি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি বিভিন্ন সরকারি কলেজে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর সরকারি কলেজে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৭ সালের ৫ মে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে যশোরের সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে যোগদান করেন। একই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর সরকারি চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ করেন তিনি। এর মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘটে তাঁর প্রায় তিন দশকের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের। অবসর জীবনে তিনি ধর্মীয় গ্রন্থ, বই-পত্রিকা পড়া এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকান্ডের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। জ্ঞানচর্চা ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখাই যেন তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
শিক্ষকতা ও সামাজিক কর্মকান্ডের স্বীকৃতি: দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এবং সামাজিক কর্মকান্ডের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অধ্যাপক ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন। তবে তাঁর কাছে সম্মাননা বা পুরস্কারের চেয়ে মানুষের ভালোবাসা ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করেননি বরং নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছেন।
সাংগঠনিক কর্মকান্ডে সক্রিয়: জীবনের ৭৫ বছর বয়সেও প্রফেসর ফেয়ারক্রস সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকা-ে সক্রিয়। তিনি সুনামগঞ্জ প্রেসবিটারিয়ান চার্চের সভাপতি এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বয়স তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধকে কাজে লাগিয়ে তিনি এখনও মানুষের সঙ্গে স¤পৃক্ত রয়েছেন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট।
একজন নীরব আলোকবর্তিকা: প্রফেসর ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রসের জীবনকে শুধু একজন শিক্ষকের কর্মজীবনের ইতিহাস হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবনের সঙ্গে শিক্ষা, নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। তাঁদের অনেকেই আজ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। একজন শিক্ষক হিসেবে এটিই তাঁর জীবনের বড় অর্জন।
প্রফেসর ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ারক্রস স্যারকে নিয়ে এই লেখা কেবল একটি সাক্ষাৎকারের বর্ণনা নয় বরং সুনামগঞ্জের একজন নীরব আলোকবর্তিকার কর্মময় জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোরও একটি প্রয়াস। তাঁর জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে, এটাই প্রত্যাশা।
শেষ কথা: প্রফেসর ন্যাথানায়েল এডউইন ফেয়ার ক্রস সুনামগঞ্জের শিক্ষা ও সামাজিক অঙ্গনের একজন আলোকিত মানুষ। তাঁর সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনের অভিজ্ঞতা, শিক্ষাদর্শন ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষার্থীদের কাছে যেমন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তেমনি নতুন প্রজন্মের জন্যও তা অনুসরণীয়। এই গুণী শিক্ষাবিদের সুস্বাস্থ্য, সুখ-শান্তি ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

[লেখক : আকরাম উদ্দিন, গল্পকার ও সাংবাদিক]

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com