দেশে শিশুধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শিশুধর্ষণের ১ হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৯৯৮টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসে যেখানে ৭৫১টি মামলা হয়েছিল, সেখানে দুই বছরের ব্যবধানে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই পরিসংখ্যান আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে ১২ হাজার ৪৪৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে ৪ হাজার ২৫টি। ২০২৫ সালেও নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে ২১ হাজার ৯৩৯টি মামলা হয়েছিল। এসব তথ্য প্রমাণ করে, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের সামাজিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো- শিশুরা অনেক সময় অপরিচিত ব্যক্তির হাতে নয়, বরং পরিচিতজন, স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা বিশ্বাসভাজন মানুষের দ্বারাই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ালেই এ অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা ও প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
শিশুধর্ষণের ঘটনায় অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জা, ভয়, চাপ কিংবা অপরাধীর প্রভাবের কারণে মামলা করতে দেরি করে। কখনো ঘটনা গোপনও রাখা হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতন কোনো পারিবারিক বা সামাজিক বিষয় নয়; এটি গুরুতর অপরাধ। ভুক্তভোগী শিশুর কোনো দায় নেই। বরং তার পাশে দাঁড়ানো এবং তাকে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দেওয়া পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব।
দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫। মামলার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের মধ্যে বিচার এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। তাই শিশুধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে শিশুবান্ধব করতে হবে। ভুক্তভোগী শিশুকে বারবার হয়রানি বা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা যাবে না। পুলিশ, চিকিৎসক, আদালত, আইনজীবী ও সমাজসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে।
পরিবারকে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ স¤পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা কোনো অনাকাক্সিক্ষত আচরণ বা স্পর্শের ঘটনা নির্ভয়ে জানাতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা ও নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা চালু করা দরকার। শিশুধর্ষণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থামাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধীর পরিচয় বা প্রভাব নয়, অপরাধের গুরুত্বই যেন বিচারের মানদ- হয়। একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব তার অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে একযোগে এগিয়ে আসতেই হবে।