:শেরগুল আহমেদ:
মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধ জাগ্রত না হলে শুধু আইন দিয়ে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয় - এই চিরন্তন সত্যটি যুগে যুগে বিশ্ববরেণ্য সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক এবং মনীষীদের চিন্তায় বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। একটি রাষ্ট্র বা সমাজে অপরাধ দমনের জন্য আইনের শাসন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু মানুষের ভেতরের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত না হলে সেই আইন নিছক কিছু কাগজের দলিলে পরিণত হয়। বর্তমান বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। সমাজ সংস্কারকদের দৃষ্টিতে বিবেক ও মূল্যবোধসমাজ পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি যে মানুষের অন্তরের পরিবর্তন, সে বিষয়ে দেশী ও বিদেশী সমাজ সংস্কারকগণ সুনির্দিষ্ট মতামত দিয়ে গেছেন:
মহাত্মা গান্ধী :
ভারতীয় উপমহাদেশের মহান নেতা ও সমাজ সংস্কারক মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “আদালত বা আইন মানুষের বিবেককে শাসন করতে পারে না। ভেতরের আলো (ওহহবৎ খরমযঃ) বা বিবেক যদি জাগ্রত না হয়, তবে বাইরের কোনো শক্তিই মানুষকে সৎ পথে রাখতে পারে না।” তিনি সমাজ পরিবর্তনের জন্য আত্মশুদ্ধি এবং অহিংস নৈতিক মূল্যবোধের ওপর জোর দিয়েছিলেন।
রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর :
বাংলার নবজাগরণের এই দুই অগ্রদূত উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল ব্রিটিশদের তৈরি আইন দিয়ে সতীদাহ প্রথা বন্ধ বা বিধবা বিবাহ চালু করলেই সমাজ বদলাবে না। তাই তারা শিক্ষার প্রসার এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে মানুষের ভেতরের সামাজিক বিবেককে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছিলেন।
সক্রেটিস ও প্লেটো :
গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের মতে, “জ্ঞানই পুণ্য (কহড়ষিবফমব রং ারৎঃঁব)”। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যখন প্রকৃত জ্ঞানের আলোয় নিজের বিবেককে চিনতে পারে, তখন সে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অন্যায় থেকে দূরে থাকে। প্লেটো তার ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য আইনের চেয়ে নাগরিকদের নৈতিক চরিত্র গঠনকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
নেলসন ম্যান্ডেলা :
আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের এই মহান নেতা বলেছিলেন, “শিক্ষা হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, যা দিয়ে বিশ্বকে পরিবর্তন করা যায়।” এখানে শিক্ষা বলতে তিনি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বোঝাননি, বরং মূল্যবোধ ও মানবিকতার শিক্ষাকে বুঝিয়েছেন, যা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট :
আইন ও বিবেকের দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের সংবিধানে এবং দ-বিধিতে অপরাধ দমন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ এবং মানবাধিকার রক্ষার জন্য অসংখ্য কঠোর আইন রয়েছে। এমনকি অনেক অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধানও রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র কী বলছে? টেকসই সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু আইনের ওপর নির্ভর করার সীমাবদ্ধতাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা ও দুর্নীতি :
বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, কিন্তু অভাব রয়েছে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের। যখন মানুষের ব্যক্তিগত বিবেক লোপ পায়, তখন আইন রক্ষকেরাও দুর্নীতির আশ্রয় নেন। বিবেকহীন সমাজব্যবস্থায় অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকর গলে কিংবা অর্থ ও পেশী শক্তির জোরে পার পেয়ে যায়।
সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয় :
বর্তমান বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং-এর বিস্তার, পারিবারিক কলহ, বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা এবং সামাজিক সহনশীলতা কমে যাওয়ার পেছনে আইনের শিথিলতা যতটা দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী নৈতিক মূল্যবোধের অভাব। সন্তানকে আইনের ভয় দেখিয়ে নয়, বরং নৈতিক শিক্ষা দিয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়।
দুর্নীতি ও অর্থপাচার :
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। এর মূল কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভেতর দেশপ্রেম এবং সততার মতো মৌলিক মূল্যবোধের চরম অভাব। আইন কেবল অপরাধের পর শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু অপরাধ করার মানসিকতা তৈরি হওয়া বন্ধ করতে পারে না। বিবেক জাগ্রত করার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের উপায় একটি সুন্দর, সাম্যবাদী ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে আইনের শাসনের পাশাপাশি মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধকে জাগ্রত করার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
পারিবারিক শিক্ষার পুনরুজ্জীবন :
পরিবার হলো মূল্যবোধ শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। শৈশব থেকেই সন্তানদের সততা, পরমতসহিষ্ণুতা, সহানুভূতি ও নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার :
কেবল জিপিএ-৫ বা চাকরি পাওয়ার পড়াশোনা নয়, বরং শিক্ষাক্রমের প্রাথমিক স্তর থেকেই নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা :
সকল ধর্মের মূল বাণীই হলো মানবতা ও সততা। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মানুষের মাঝে এই মানবিক চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে।
সংস্কৃতি ও সুস্থ বিনোদন :
অপসংস্কৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা, নাটক, সাহিত্য ও দেশাত্মবোধক কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
উপসংহার :
আইন হলো সমাজের বাইরের কাঠামোকে ধরে রাখার একটি কঙ্কাল মাত্র, আর নৈতিকতা ও বিবেক হলো তার প্রাণ। প্রাণহীন কঙ্কাল যেমন চলতে পারে না, তেমনি বিবেকহীন সমাজে শুধু আইন দিয়ে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন নাগরিকরা ভেতর থেকে সেই আইনকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা পোষণ করে। অতএব, বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এবং একটি বৈষম্যহীন, টেকসই সমাজ গঠনে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের সুপ্ত বিবেক ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
[শেরগুল আহমেদ : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ]