সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ইজারাবিহীন ধোপাজান নদীতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন শুধু একটি নদীর স¤পদ লুটের ঘটনা নয়; এটি পরিবেশ, জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর সংঘবদ্ধ আঘাত। বারবার অভিযান, নৌযান জব্দ কিংবা শ্রমিক-মাঝি গ্রেপ্তারের পরও যদি একই চক্র আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল নদীতে নয় - সমস্যার শিকড় আরও গভীরে।
এই বাস্তবতায় ধোপাজান নদীর গুরুত্বপূর্ণ ডলুরা এলাকায় উচ্চ ক্ষমতাস¤পন্ন নাইট ভিশন সিসি ক্যামেরা স্থাপন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। থানায় বসেই ২৪ ঘণ্টা নদীর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা গেলে রাতের আঁধারে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ও পরিবহন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিকে আরও কার্যকর, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে পারে।
তবে শুধু সিসি ক্যামেরা স্থাপন করলেই ধোপাজানের বালু-পাথর লুট বন্ধ হবে - এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের সে কথাই বলে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান হয়েছে, বালুবাহী বাল্কহেড ও অন্যান্য নৌযান জব্দ হয়েছে, শ্রমিক-মাঝি গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, মূলত যারা এই অবৈধ বাণিজ্যের নেপথ্যে থেকে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছে। ফলে অভিযানের সুফল স্থায়ী হয়নি।
এখানেই প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সিসি ক্যামেরায় যদি অবৈধ উত্তোলনকারী নৌযান শনাক্ত হয়, তাহলে শুধু নৌকার মাঝি বা শ্রমিককে আটক করে দায় শেষ করলে চলবে না। নৌযানের মালিক, অর্থের জোগানদাতা, অবৈধ বালু-পাথরের ক্রেতা-বিক্রেতা এবং নেপথ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিও একসময় আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে।
ধোপাজান নদীকে ঘিরে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তীরবর্তী জনপদ ও পরিবেশও হুমকির মুখে পড়ছে। নদী থেকে নির্বিচারে বালু-পাথর তুলে নেওয়া হলে একদিকে যেমন নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ে, অন্যদিকে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকেই।
এ কারণে ধোপাজানকে রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি নদীর প্রবেশ ও নির্গমনপথে নিয়মিত নজরদারি, নৌপুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান, অবৈধ নৌযানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং জব্দকৃত বালু-পাথর ও নৌযানের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণ ও প্রয়োজন হলে মামলার তদন্তে তা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি এই অবৈধ কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তদন্তে প্রমাণ মিললে তাকেও ছাড় দেওয়া যাবে না। কারণ নদী কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। নদীর বালু-পাথর জনগণের স¤পদ, আর সেই স¤পদ রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
ধোপাজানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন তাই কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়; এটি প্রশাসনের জন্য একটি নতুন পরীক্ষাও। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি অপরাধী শনাক্ত করা, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং নেপথ্যের হোতাদের আইনের আওতায় আনা যায়, তবে উদ্যোগটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। আর যদি ক্যামেরার চোখের সামনে লুটপাট চলতেই থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে- নজরদারির ঘাটতি কোথায়, নাকি প্রয়োগের জায়গাতেই সমস্যা?
আমরা আশা করি, প্রশাসন এবার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবে। ধোপাজানের বালু-পাথর লুট বন্ধে সিসি ক্যামেরার চোখ যেন শুধু নদীর ওপর না থাকে; সেই চোখ যেন অবৈধ বাণিজ্যের পুরো নেটওয়ার্কের দিকেও থাকে। প্রযুক্তির সঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগ, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং জনস¤পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে ধোপাজানকে রক্ষা করা সম্ভব।