‎দ্রোহের কবি নজরুল: গুলশান আরা রুবী

আপলোড সময় : ২৭-০৮-২০২৬ ০৬:০৮:৪৪ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৭-০৮-২০২৬ ০৬:০৮:৪৪ অপরাহ্ন
বাংলা সাহিত্যের আকাশে কিছু নক্ষত্র কেবল আলো দেয় না, পথও দেখায়। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই এক অগ্নিদীপ্ত নক্ষত্র। তিনি শুধু কবি নন তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারিত এক দুর্বার কণ্ঠ, শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের এক অনিঃশেষ প্রেরণা, সাম্য ও মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর কবিতায় যেমন বিদ্রোহের আগুন, তেমনি আছে প্রেমের কোমলতা; যেমন আছে শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান, তেমনি আছে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার ডাক। তাই নজরুলকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধায় সীমাবদ্ধ করলে তাঁর বিশাল সৃষ্টিসত্তার প্রতি সুবিচার করা হয় না। ‎১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া নজরুল শৈশব থেকেই দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও বৈষম্যের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হন। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত তাঁর চেতনাকে করেছে শাণিত। লেটো দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, সৈনিকজীবন, সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের স্বতন্ত্র সৃষ্টিশক্তির পরিচয় দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থির সময় এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতায় তাঁর কবিসত্তা ক্রমেই বিদ্রোহের ভাষা খুঁজে নেয়। ‎ ‎নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা সাহিত্যে যেন এক বিস্ফোরণ। কবিতাটি প্রকাশের পর তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু তাঁর বিদ্রোহ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা একটি বিশেষ শাসকের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর বিদ্রোহ ছিল অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, পরাধীনতা, ধর্মান্ধতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে। বাংলা একাডেমির একটি আলোচনায়ও নজরুলের বিদ্রোহকে ইংরেজ শাসন থেকে শুরু করে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নানা ধরনের বৈষম্য-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিস্তৃত বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‎ ‎নজরুলের বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ। তিনি মানুষকে ভয়কে জয় করতে শিখিয়েছেন। তাঁর কবিতার ‘উন্নত শির’ যেন পরাধীন মানুষের আত্মপরিচয়ের ঘোষণা। তাঁর কাছে স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নয়; মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারও স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‎ ‎তাঁর ‘ভাঙার গান’, ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘সাম্যবাদী’সহ বিভিন্ন রচনায় প্রতিবাদী চেতনার শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে। একই সঙ্গে তাঁর সাংবাদিকতাও ছিল সংগ্রামের হাতিয়ার। তিনি কলমকে কখনো কেবল সৌন্দর্যচর্চার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের অধিকার ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ‎ ‎নজরুলের দ্রোহের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। তিনি ধনী-গরিব, জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা নারী-পুরুষের বৈষম্য মেনে নেননি। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যে তিনি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যেখানে মানুষের পরিচয় তার মানবিক মর্যাদায় জন্ম, ধর্ম কিংবা সামাজিক অবস্থানে নয়। তাঁর সাম্যচেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন। ‎ ‎এই কারণেই নজরুল একই সঙ্গে বিদ্রোহের ও মানবতার কবি। শোষিত মানুষের কান্না তাঁকে বিচলিত করেছে, নিপীড়িতের আর্তনাদ তাঁকে বিদ্রোহী করেছে। নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং নিপীড়িতের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর সাহিত্যজুড়ে বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর বিদ্রোহ আসলে মানবমুক্তিরই অন্য নাম। ‎ ‎তবে নজরুল কেবল অগ্নির কবি নন। তাঁর অন্তরে ছিল গভীর প্রেম ও সৌন্দর্যবোধ। এক হাতে তিনি ধরেছেন রণতূর্য, অন্য হাতে বাঁশি। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি ও মানবিক আবেগ তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। ‘দোলনচাঁপা’, ‘চক্রবাক’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’সহ নানা কাব্যগ্রন্থে তাঁর কোমল ও প্রেমময় সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। ‎ ‎নজরুলের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন তাঁকে ব্যথিত করেছে। তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ভেতর দুই ধর্মীয় ঐতিহ্যের নানা উপাদানকে সৃষ্টিশীলভাবে ধারণ করেছেন। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় ধর্ম মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু মানবিকতার ঊর্ধ্বে কোনো বিভাজনই স্থান পেতে পারে না। ‎ ‎আজকের পৃথিবীতে যখন নানা রকম বৈষম্য, উগ্রতা, অসহিষ্ণুতা ও অন্যায় আমাদের সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, তখন নজরুলের প্রয়োজন আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। কারণ তাঁর দ্রোহ কোনো অতীতের রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন বিবেকের কণ্ঠস্বর। যেখানে মানুষের অধিকার হরণ হবে, যেখানে দুর্বলকে দমন করা হবে, যেখানে ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি হবে, যেখানে বৈষম্য মানুষকে অপমানিত করবে সেখানেই নজরুলের কবিতা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। ‎ ‎নজরুলকে ভালোবাসা মানে শুধু তাঁর কবিতা আবৃত্তি করা নয়; তাঁর চেতনার সঙ্গে নিজেদের জীবন ও সমাজকে মিলিয়ে দেখা। তাঁর ‘বিদ্রোহ’কে বুঝতে হলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করতে হবে। তাঁর ‘সাম্য’কে বুঝতে হলে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। তাঁর ‘মানবতা’কে ধারণ করতে হলে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানকে জীবনের মূলনীতি করতে হবে। ‎ ‎নজরুল আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেমে যায়নি। তাঁর কবিতা, গান ও চিন্তার ভেতর দিয়ে তিনি এখনো কথা বলেন। তিনি আমাদের শেখান অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই মানুষের মর্যাদা। তাই নজরুল কোনো নির্দিষ্ট সময়ের কবি নন; তিনি প্রতিটি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে জেগে ওঠা মানুষের কবি। ‎ ‎দ্রোহের কবি নজরুল তাই শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নন তিনি বাঙালির চিরজাগ্রত বিবেক। তাঁর অগ্নিবীণা যতদিন বাজবে, ততদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠে প্রতিবাদের সুর থাকবে। তাঁর সাম্যের স্বপ্ন যতদিন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, ততদিন মানবিক ও বৈষম্যহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষাও বেঁচে থাকবে। আর সেই কারণেই সময়ের পর সময় পেরিয়ে নজরুল আমাদের কাছে ফিরে আসবেন একটি উন্নত শির, একটি জাগ্রত বিবেক এবং একটি অদম্য দ্রোহের নাম হয়ে। ‎

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com