শিল্প প্রতিভা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নয়

আপলোড সময় : ২৬-০৮-২০২৬ ০৮:৩৭:১১ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৬-০৮-২০২৬ ০৮:৩৭:১১ পূর্বাহ্ন
মোহাম্মদ আব্দুল হক:: রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের পরপর জনগণের ভোটের মাধ্যমে নতুন করে সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন এবং দেশ পরিচালনায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় মনোনিবেশ করেন। সরকার সময়োপযোগী পদক্ষেপ পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেন। নতুন সরকারের বিবেচনা অনুযায়ী কেউ কেউ যোগ্য মন্ত্রী হতে পারেন আবার কিছুদিন পরপর সরকারের বিবেচনায় কেউ কেউ বদল হতেও পারেন। এটা স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় ভালো করলে দেশের জনগণের ভালো হয়, মন্দ করলে দেশের জনগণের দুর্ভাগ্য। কিন্তু সরকার বদলের সাথে সাথে কি কোনো দেশের শিল্প সাহিত্যে বা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিভাবানও বদলে যায়? সরকার বদলের সাথে সাথে কি হঠাৎ করে নতুন নতুন প্রতিভাবান জন্ম নিতে পারেন? ভোটের মাধ্যমে নেতা পরিবর্তন আর সেই সাথে প্রতিভা পরিবর্তন কি সমান্তরাল! এই বিষয়টি নিয়ে অল্প কথা। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি কিন্তু সবসময়ই একটি দেশকে একটি জাতিকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে চলে। এখানে রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ চলে না। এটা নদীর ¯্রােতধারার মতো প্রবহমান। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন পড়ে। তবে শাসন বা নিয়ন্ত্রণ চলতে পারে না। আমরা যারা নিয়মিত বা অনিয়মিত শিল্প সাহিত্যের খোঁজ রাখি বা রাখতে হয়, জানি, এদেশে কিছু রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পুরস্কার আছে। এসব পুরস্কার দেয়া হয় প্রতিবছর আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এটা ভালো একটা দিক। দেশের সকলকে তো সম্ভব নয়। তাই একটি দেশের প্রতিভাবানদের মধ্যে থেকে বিশেষ কয়েকজনকে মূল্যায়ন করা হয়। আমার সাদা চোখে দেখা থেকে এখানেই প্রশ্ন জাগে। নিয়ম হলো দল বা পক্ষ না-দেখে প্রকৃত প্রতিভার মূল্যায়ন করে প্রতিভাবানদেরকে পুরস্কার দেয়া। কারা পুরস্কার দেন? আমরা জানি, যখন যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকেন তারা দেন! কিভাবে ও কাদেরকে দেন? এ পর্যন্ত আমার চোখে ধরা পড়েছে, যেভাবে যাদেরকে দেয়া হয় দেখে মনে হয় যেনো এদেশে সরকার বদলের সাথে সাথে প্রতিভাও বদলে যায়! যখন যারা রাষ্ট্র ক্ষমতা পায় তারা কেবল দেখে তাদের দলেই ঠাসা প্রতিভা এবং এর বাইরে সংসদের ভিতরে কিংবা সংসদের বাহিরে যারা বিরোধী রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে জড়িত তাদের মধ্যে যেনো কোনো শিল্প সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক প্রতিভা একেবারেই নাই। মনে হয়, যারা দায়িত্বে থাকেন তারা যেনো নিজেদের দল বা বলয়ের বাহিরে দেশে আর শিল্প সাহিত্যের অঙ্গনে প্রতিভা খোঁজে পান না! আর কাউকে প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে যেনো তাদের সাহসে কুলোয় না অথবা এতে তারা কার্পণ্যতার জালে জড়িয়ে থাকেন। আমি কিন্তু এ কথা বিশ্বাস করতে চাই না যে ক্ষমতার শীর্ষের নেতৃত্ব থেকে এমন কার্পণ্যতা দেখানোর ইঙ্গিত থাকতে পারে। বিগত কয়েক দশক ধরে দেখে আসছি! যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় তখন যেনো সব প্রতিভা শুধু তাদের দলে। একই অবস্থা অন্য দলের ক্ষেত্রেও চলে এসেছে অতীতে! অনেক সময় একজন হয়তো ক্ষমতাসীন দলের বাইরে পুরস্কার পায়, সেক্ষেত্রে দেখা হয় রাজনৈতিক স্বার্থে সমমনা কি-না! এমনটা কেন হয়! ক্ষমতা পাওয়ার পরে কি তখন তারা পুরোপুরি দলকানা বা স্বার্থান্ধ হয়ে যান! তা না-হলে দলের বাইরে প্রতিভাবান খোঁজে পান না কেন? আমরা সাধারণ শ্রোতা বা সরাসরি পাঠক যারা, তারাতো ইউটিউবে বা টেলিভিশনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিভাবানদের কণ্ঠে গান শুনি, আবৃত্তি শুনি এবং মুগ্ধ হই। আমরা সাধারণ পাঠক যারা তারাতো অনলাইনে কিংবা মলাটবদ্ধ বই কিনে বই পড়ি এবং মুগ্ধ হই। আমরা যখন যাদের লেখা বই পড়ি তারা যে শুধু চলমান ক্ষমতাসীন দলের এমনতো নয়! আমরা সেভাবে খুঁজেও পড়ি না। আমরা লেখকের বইটি কিনে পড়ি বা উপহার হিসেবে পেয়ে পড়ি। আমরা সাধারণ পাঠক দল দেখি না। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে পুরস্কার দেয়ার ক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছে বেশি। কখনও এমন হয়েছে পুরস্কারের জন্য নাম ঘোষণা হওয়ার পরে দলের পক্ষ থেকে হৈচৈ বা বিরোধিতা শুরু হয়ে গেছে এবং সত্যি সত্যিই পরবর্তীতে ওই নামটি বাতিল হয়ে গেছে। এমনটা কাম্য নয়। পুরস্কার দেয়ার ক্ষেত্রে দল নয় প্রতিভার যেনো মূল্যায়ন হয়। এমনটা শুধু কেন্দ্রে নয়! বিভাগ, জেলা, উপজেলা সবখানেই শিল্প সাহিত্যে এভাবেই এমন পুরস্কার দেয়া হয়! ব্যতিক্রম কিছু লক্ষ্য করা যায়, সেটার উদ্দেশ্য যেনো এমন, “কেউ কোনো প্রশ্ন করলে বলতে পারবো ওইতো অমুক আমাদের দল করেন না, তবুও দিয়েছি!” হা হা! কি বিস্ময়কর ব্যাপার। বলছিলাম রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বা সরকারি বিভিন্ন পুরস্কার পাওয়া নিয়ে কথা। কিছু ব্যতিক্রম বাদে, এমটাই চলছে এবং এভাবেই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বা দলের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করে চলা কেউ কেউ পুরস্কার নিচ্ছেন বহু হাততালি পাচ্ছেন ও মনেমনে আত্মতুষ্টি উপভোগ করছেন! পুরস্কারের মতো একটি অতি মূল্যবান বস্তু যেভাবেই হোক পেতে হবে কেন! এটাতো সাধনার দ্বারা অর্জন করতে হয়। কি আশ্চর্য! এখানে অধিকাংশ মানুষ মেকি বাহবা পেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। আবার অধিকাংশ মানুষ না-বুঝেই ছোঁয়াছে ভাইরাসের সংক্রমণের মতো একজনের সাথে সাথে বহুজনে হাততালি দেয়। কেউ কেউ আবার বুঝেও মিথ্যা মিথ্যা হাততালি দেয়, নির্দিষ্ট ওই পুরস্কারপ্রাপ্ত মানুষটাকে আপাতত খুশি করার জন্য। হয়তো তাদের উদ্দেশ্য থাকে, যদি কখনও উনাকে প্রয়োজন পড়ে! আশ্চর্যের বিষয়। আমাদের প্রয়োজনে যদি বন্ধুত্বের খাতিরে বা সামাজিক স¤পর্কের যোগাযোগে আমরা একজনকে না-পাই, তাহলে কিসের জন্য এতো কষ্ট করে ওই একজনের সাথে কথা বলা বা যোগাযোগ রক্ষা করে চলা! ভাবতে হবে, সম্পর্কের ভিত্তিতেই মানুষ মানুষের প্রয়োজনে কাছে আসবে। এখানে কোনো মেকি বাহবা বা কৃত্রিম যোগাযোগ ভিত্তি হতে পারে না। যার প্রতিভা আছে সে অবশ্যই বাহবা পাবে। এটা তার অর্জন। কোনো মানুষের প্রতিভা আদৌও আছে কি-না সেটা যাচাই না-করে যারা হাজার হাজার হাততালি দেয় সেটা সাময়িক এবং অল্প পরেই তা আর প্রতিধ্বনিত হয় না। হারিয়ে যায় কিংবা যে হাততালি দিলো সে নিজেও কিছু পরে ‘দূরছাই!’ বলে হাত ঝেড়ে বা টিস্যুতে মুছে বা বেসিনে ধুয়ে ফেলে দেয়। যারা হাততালি পান তারা কি জানেন না! অনেক সময় হাজার হাজার সাময়িক মেকি হাততালির চেয়ে জ্ঞান নির্ভর অল্প হাততালি অনেক অনেক বেশি মূল্যবান এবং সম্মানের! কতো বেশি হাততালি হচ্ছে সেদিকে লক্ষ না-রেখে কারা হাততালি দিচ্ছেন শিল্প সাহিত্য বা যেকোনো সৃজনশীল কর্মের ক্ষেত্রে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে মননশীল ও শিল্পিত অল্প মানুষের হাততালি সময়ে স্থায়িত্ব পেয়ে প্রকাশিত প্রতিভাকে বিকশিত করে যুগে যুগে! শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো নয়, অনেক সাধনা করতে হয়। ক্ষমতার পালা বদলের সাথে সাথে সৃজনশীল অঙ্গনের সবকিছু নতুনদের দখলে চলে যাওয়া শিল্প সাহিত্যের বিকাশের শুভ লক্ষণ নয়। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গন দখল করলেই শিল্পী সাহিত্যিক সাংস্কৃতিক হওয়া যায় না। এসব সাধনার বিষয় এবং গুণ থাকতে হয়। আরেকটু সহজ ভাষায় বলা যায়, শিল্প, সাহিত্য কিংবা সংস্কৃতির মঞ্চ বা ক্ষেত্র বা প্লাটফর্ম যা-ই বলি, এসব ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে দখল করে প্রচার-প্রচারণার আলোয় হয়তো সাময়িকভাবে পরিচিতি পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়ার জন্য কিংবা প্রকৃত শিল্পী বা সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ার জন্য যে কালজয়ী সৃষ্টিশীলতা ও মেধা প্রয়োজন, তা কেবল দখলদারিত্ব দিয়ে অর্জন করা অসম্ভব। যারা প্রকৃত অর্থে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল তারা পুরস্কারের জন্য বা স্বীকৃতির জন্য তাড়াহুড়ো করেন না, বরং আজীবন ধ্যান ও জ্ঞান সাথে রেখে সাধনা করার ব্রত নিয়ে কাজ করেন মানুষের জন্য, পরিচ্ছন্ন সমাজের জন্য, শান্তিময় দেশের জন্য এবং সকল ধর্মের, নানান বর্ণের মানুষের সহাবস্থানের ক্ষেত্র হিসেবে একটি পৃথিবী গড়ার জন্য।। [লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com