সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ (সাচনা বাজার) সড়ক ছিল হাওরাঞ্চলের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন সড়ক। দুই পাশে সারি সারি গাছ, ছায়াঘেরা পরিবেশ আর সবুজের সমারোহ পথচারী ও যাত্রীদের প্রশানিমশ দিত। অথচ সেই সৌন্দর্য এখন নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের কারণে বিলীন হওয়ার পথে। প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ শুধু একটি সড়কের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, এটি হাওরাঞ্চলের বিপন্ন পরিবেশের ওপরও নতুন আঘাত।
বন বিভাগের ভাষ্য, সামাজিক বনায়নের মেয়াদ শেষ হয়েছে এবং পরিপক্ব হয়ে অনেক গাছ মরে যাচ্ছে - তাই গাছগুলো কর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরিপক্ব হলেই কি একটি সড়কের হাজার হাজার গাছ একসঙ্গে কেটে ফেলাই একমাত্র সমাধান? গাছের বয়স ও কাঠের বাজারমূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি পরিবেশগত মূল্যায়ন কি করা হয়েছে? স্থানীয় মানুষ যখন দাবি করছেন, ভালো ও জীবন্ত গাছও কাটা হচ্ছে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো গাছগুলোর বিক্রয়মূল্য। কয়েক কোটি টাকার স¤পদ মাত্র ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে বন বিভাগ জানিয়েছে। গাছের প্রকৃত বাজারমূল্য, দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা জরুরি। জনগণের স¤পদ বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
২০২৪ সালেও গাছ কাটার উদ্যোগ প্রতিবাদের মুখে স্থগিত হয়েছিল। এবার সড়ক প্রশস্তকরণ ও উড়াল সড়ক প্রকল্পের কাজের অজুহাতে সেই বৃক্ষনিধন নতুন করে শুরু হয়েছে - এমন অভিযোগও উঠেছে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু উন্নয়নের নামে নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিকল্প নকশা, প্রয়োজনীয় গাছ সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে বড় পরিসরে পুনঃবনায়নের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
আমরা মনে করি, অবশিষ্ট গাছ কাটার আগে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা জরুরি। কোন গাছ প্রকৃতপক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ, কোনটি প্রকল্পের জন্য অপরিহার্যভাবে অপসারণ করতে হবে - তা নির্ধারণ করতে হবে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মাধ্যমে। পাশাপাশি বিক্রি হওয়া গাছের মূল্য ও দরপত্র প্রক্রিয়াও জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
সুনামগঞ্জে বনভূমি এমনিতেই সীমিত। হাওরের এই সবুজ জনপদে সড়কের গাছগুলো শুধু কাঠের স¤পদ নয়; এগুলো মানুষের ছায়া, পাখির আশ্রয়, পরিবেশের ভারসাম্য এবং এলাকার নান্দনিকতার অংশ। তাই উন্নয়নের নামে সাড়ে চার হাজার গাছ হারিয়ে ফেলার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে থামতে হবে। প্রকৃতি রক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই উন্নয়নের পথ খুঁজতে হবে। অন্যথায় আজকের উন্নয়নই আগামী দিনের পরিবেশগত দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।