আমীন আল রশীদ:
বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়াটা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ বিএনপি যখন তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিলো, তখনই এটা নিশ্চিত হয়ে গেছে যে তিনিই হচ্ছেন পরবর্তী তথা দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। কেননা, সংবিধান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে- যদি একাধিক প্রার্থী থাকেন।
১৯৯১ সালের পরে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে এমপিদের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কেননা, একাধিক প্রার্থী ছিল না। এবার প্রার্থী ছিলেন দুজন। সরকারি দল বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন অলি আহমদ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী এই নির্বাচনে এমপিদের প্রকাশ্যে ভোট দিতে হয়। অর্থাৎ তিনি কাকে ভোট দিলেন, সেটি ব্যালট পেপারে উল্লেখ থাকতে হয়। অন্যদিকে সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদে এমপিদের দলের পক্ষে ভোট দিতে হয়। তার মানে একদিকে বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ আসন এবং অন্যদিকে সংবিধানের এই বাধ্যবাধকতার কারণে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন মানেই তিনি যে রাষ্ট্রপতি - সেটি ছিল অবধারিত। প্রশ্ন হলো, যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও গোপন ব্যালটে ভোট হতো এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের এই বিধান না থাকতো; এমপিরা যদি রাষ্ট্রপতি পদে দলের মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য না থাকতেন, তাহলেও কি মির্জা ফখরুল ইসলামের হেরে যাওয়ার শঙ্কা থাকতো? অর্থাৎ তখন কি বিরোধী জোটে প্রার্থী অলি আহমদের জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যেতো? সহজ উত্তর হলো ‘না’। বরং তখন অলি আহমদ হয়তো আরও কিছু ভোট কম পেতেন।
বৃহ¯পতিবার (২০ আগস্ট) সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য। তার মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট এবং অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। যেহেতু দল মনোনীত প্রার্থীকেই ভোট দিতে এমপিরা বাধ্য, ফলে জামায়াত ও এনসিপির এমপিরা স্বভাবতই অলি আহমদকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু দলীয় প্রার্থীকে ভোটদানের বাধ্যবাধকতা না থাকলে জামায়াত ও এনসিপির অনেক এমপিও হয়তো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তি ইমেজ বিবেচনায় মির্জা ফখরুলকেই ভোট দিতেন। পক্ষান্তরে, বিএনপির কোনও এমপি অলি আহমদকে ভোট দিতেন - এই সম্ভাবনা কম।
এসব অঙ্কের কারণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় সুনিশ্চিত জেনেও যে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়াকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ বলে মনে করে বিরোধী দল। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিও এটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির একটি উদাহরণ বলে মনে করেন। অবশ্য বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ভোটের দিন সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে বলেছেন, এই বিধান এমপিদের হাত-পা বেঁধে দিয়েছে।
এটি খুব সাধারণ প্রশ্ন যে ভোট মানেই যেহেতু একটা গোপন ব্যাপার, অতএব, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমপিরা কেন প্রকাশ্যে ভোট দেন বা কে কাকে ভোট দিলেন, সেটি কেন জানার সুযোগ থাকে? ১৯৯১ সালে যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন করা হয়, এই প্রশ্ন তখনও উঠেছিল। এর একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয় এরকম যে সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদের সব কাজ প্রকাশ্যে হয়। যেমন- সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যখন কোনও বিল সংশোধ উত্থাপন করেন, তখন স্পিকার সেটি ভোটে দিয়ে বলেন- ‘যারা এই প্রস্তাবের পক্ষে আছেন তারা ‘হ্যাঁ’ বলুন; যারা প্রস্তাবের বিপক্ষে আছেন তারা ‘না’ বলুন।’ তখন সরকারি দলের এমপিরা ‘হ্যাঁ’ এবং বিরোধীরা ‘না’ বলেন। ক্ষেত্রবিশেষে তারা চুপ থাকেন। তার মানে বিল পাসের ক্ষেত্রে এমপিদের গোপন ভোট নেওয়া হয় না।
একই যুক্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচকেও সংসদীয় কাজের অংশ বলে মনে করা হয়। যেহেতু সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করেন এমপিরা এবং এই ভোট হয় সংসদ ভবনে - সেহেতু এখানেও এমপিদের ভোটদানের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার বিষয়টি রাখা হয়নি। কিন্তু এই যুক্তির বিপরীতে পাল্টা যুক্তিও আছে।
অনেকেই এটা মনে করেন যে সংসদে ভোটদানের ক্ষেত্রে যদি এমপিদের ওপর কোনও সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে ফ্লোর ক্রসিংয়ের শঙ্কা বেড়ে যাবে এবং ঘন ঘন সরকার বদল হবে - যা দেশকে অস্থিতিশীল করে দেবে। কিন্তু সেই সীমারেখাটি কতদূর পর্যন্ত, সেটি হচ্ছে মূল আলোচনা। সাধারণ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায়ও যদি এমপিরা দলের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য হন, তখন সংসদ তথা সরকারি দল চাইলে যেকোনও গণবিরোধী বিলও পাস করতে পারে। সাংবিধানিক এই বাধ্যবাধকতার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো বিপজ্জনক আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায়ও সরকারি দলের সদস্যরা কোনও বিরোধিতা করেননি বা করতে পারেননি।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭২ সালে যখন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, তখনই সংসদে এমপিদের ভোটদানের স্বাধীনতা সম্পর্কিত এই ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছে। প্রথমে এই অনুচ্ছেদটি যেভাবে লেখা হয়েছিল, বিতর্কের পরে সেটি সংশোধন করে সংবিধানে যুক্ত করা হয়। তখন বলা হয়, শুধুমাত্র দল থেকে পদত্যাগ এবং সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে। পরবর্তীকালে এই বিধানটি আরও কঠিন করা হয়। কিন্তু ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় বাহাত্তরের মূল সংবিধানের বিধানটি পুনর্বহাল করা হয়।
তবে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যখন সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা হলো, সেখানেও ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং বিধানটি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়। এরপর জুলাই সনদেও একই প্রস্তাব করা হয় যে শুধুমাত্র আস্থাবিল ও অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনও বিষয়ে ভোটদানের ক্ষেত্রে এমপিরা স্বাধীন থাকবেন। তবে বিএনপির তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আরও দুটি পয়েন্ট যুক্ত করেছে- ১. সংবিধান সংশোধন এবং ২. রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। অর্থাৎ, বিএনপি যেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে চায় সেটি হলো এরকম- সংসদে এমপিরা আস্থাবিল, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধন এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন ছাড়া অন্য যেকোনও বিষয়ে ভোটদানের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন। তার মানে এভাবে যদি সংবিধান সংশোধন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী থাকলে - অর্থাৎ ভোট নেওয়ার প্রয়োজন হলে দল মনোনীত প্রার্থীকে ভোটদানে বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
কিন্তু তারপরও কোনও সংসদে যদি সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকলেও সরকারি দল মনোনীত প্রার্থীর বাইরে অন্য কারও নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। যদি আইন করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটে গ্রহণের বিধান করা হয় এবং ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যকতাও তুলে দেওয়া হয়, তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে। তবে আইন ও সংবিধান সংশোধন করলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে তখনই, যখন সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিদের মধ্যে আসন সংখ্যায় ব্যবধান কম থাকবে। ধরা যাক, কোনও সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে পার্থক্য ১০ বা ১৫টি আসন এবং দুই পক্ষেরই রাষ্ট্রপতি পদে ভালো প্রার্থী আছেন, তখন সরকারি দলের কিছু সদস্য যদি ভোট দিতে না আসেন এবং বিরোধীদের সবাই যদি উপস্থিত থাকেন, তখন বিরোধীদলীয় প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি পদে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। তাছাড়া দলীয় প্রার্থীকে ভোটদানের বাধ্যবাধকতা না থাকলে, এমপিরা স্বাধীনভাবে গোপন ব্যালটে অধিকতর যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তখন উভয় দলই রাষ্ট্রপতি পদে তাদের সবচেয়ে ভালো প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেবে।
[আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক]