প্রাথমিক শিক্ষায় মনিটরিংয়ের পরিধি বাড়ানো হোক, জবাবদিহিও নিশ্চিত হোক

আপলোড সময় : ২৩-০৮-২০২৬ ১২:১৩:৫৪ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৩-০৮-২০২৬ ১২:১৩:৫৪ পূর্বাহ্ন
প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি নির্মাণ করে। এই ভিত্তি দুর্বল হলে পরবর্তী স্তরের শিক্ষায় কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্মত, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এ বাস্তবতায় দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি, কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যমের প্রাথমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন নীতিমালার আওতায় সরকারি মনিটরিংয়ের মধ্যে আসবে। বাস্তবতা হলো, দেশে প্রাথমিক শিক্ষা এখন আর শুধু সরকারি বিদ্যালয়কেন্দ্রিক নয়। বিপুলসংখ্যক শিশু বেসরকারি, কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম, অবকাঠামো, শিক্ষকতার মান, নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের শিখনফল সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত নজরদারি অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। ফলে উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক শিক্ষায় একটি অভিন্ন মানদ- প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাইয়ের বিষয়টি। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২৫টি উপজেলার বিদ্যালয় পরিদর্শনে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিখন দক্ষতার বাস্তব চিত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। এ তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কাগজে-কলমে বিদ্যালয়ের সাফল্য আর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার মধ্যে যদি বড় ধরনের ব্যবধান থাকে, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ¯পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই পরিদর্শন হতে হবে নিয়মিত, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক। শুধু প্রতিবেদন গ্রহণ নয়, সরেজমিনে গিয়ে শিক্ষক উপস্থিতি, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পাঠদান, শিখনফল ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ যাচাই করতে হবে। মনিটরিংয়ের নামে যেন কেবল কাগজপত্র যাচাই বা আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। একটি বিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে ভবনের অবস্থা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, পাঠ্যবই ও কারিকুলাম অনুসরণ, শিক্ষার্থীর শেখার সক্ষমতা, খেলাধুলার সুযোগ, পুষ্টি ও নিরাপত্তা। বিশেষ করে বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়গুলোতে অনেক সময় অপ্রতুল জায়গায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান করা হয়। কোথাও কোথাও খেলার মাঠ নেই, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই, এমনকি শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিও উপেক্ষিত থাকে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও মানদ- প্রয়োগ জরুরি। শিক্ষকের যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টিও সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। একজন অপ্রশিক্ষিত শিক্ষককে শ্রেণিকক্ষে রেখে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের ন্যূনতম যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও পাঠদানের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মনিটরিং ব্যবস্থায় শিক্ষকদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি না করে তাদের পেশাগত উন্নয়নেও সহায়তা করতে হবে। প্রতিমন্ত্রী যে সাতটি বিষয়ে কোনো আপস না করার কথা বলেছেন, সেগুলোও বাস্তবায়নযোগ্য জবাবদিহির ভিত্তি হতে পারে। বিদ্যালয় কার্যকরভাবে পরিচালিত হওয়া, শিক্ষকের প্রকৃত উপস্থিতি, শিক্ষার্থীর সঠিক সংখ্যা, তারা কী শিখছে তার সরাসরি পর্যবেক্ষণ, সরকারি সুবিধা প্রকৃত শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছানো, নিরাপদ অবকাঠামো এবং অভিভাবক-শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ - এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে প্রাথমিক শিক্ষায় আস্থার সংকট অনেকটাই কাটবে। তবে মনিটরিং ব্যবস্থাকে সফল করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত জনবল, দক্ষ কর্মকর্তা এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি। প্রতিটি উপজেলায় শূন্যপদে সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়োগের উদ্যোগ তাই দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। একই সঙ্গে মনিটরিং কর্মকর্তাদেরও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়লে শুধু প্রতিবেদন তৈরি নয়, দায় নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। আমরা মনে করি, দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে মনিটরিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি হতে পারে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি বড় সুযোগ। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগের ওপর। মনিটরিং যেন কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হাতিয়ার না হয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নের কার্যকর মাধ্যম হয়, সেটিই প্রত্যাশিত। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা নয়; শিশুটি বিদ্যালয়ে গিয়ে সত্যিই শিখছে কি না, নিরাপদ পরিবেশ পাচ্ছে কি না এবং তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের উপযোগী শিক্ষা পাচ্ছে কি না - সেটিও নিশ্চিত করা। তাই সরকারি-বেসরকারি সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন মানদ-, নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন এবং কঠোর কিন্তু সহযোগিতামূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই ‘সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা’ স্লোগানটি বাস্তব অর্থে সার্থক হবে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com