শেরগুল আহমেদ:
এই গভীর জীবনদর্শনটি দেশী ও বিদেশী বহু কবির কবিতায় অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। কবিরা তাঁদের কবিতায় দেখিয়েছেন কীভাবে একটি শিশু নি®পাপ মন নিয়ে পৃথিবীতে আসে, আর আমাদের এই তথাকথিত ‘সভ্য’ ও ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ সমাজ তাকে ধীরে ধীরে কপটতা ও মিথ্যাচার শেখায়। নিচে দেশী ও বিদেশী কবিতার কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো, যেখানে এই দর্শনটি সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে: ১. বিদেশী কবি য়েভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কো (ণবামবহু ণবাঃঁংযবহশড়) “ঞবষষরহম খরবং ঃড় ঃযব ণড়ঁহম রং ডৎড়হম” রুশ কবি ইয়েভতুশেঙ্কোর সরাসরি বড়দের উদ্দেশ্য করে লিখেছেন যে, তরুণ বা শিশুদের কাছে মিথ্যা বলা এবং সেই মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা একটি অপরাধ। কবিতার কিছু অংশ এমন: “ঞবষষরহম ষরবং ঃড় ঃযব ুড়ঁহম রং ৎিড়হম. / চৎড়ারহম ঃড় ঃযবস ঃযধঃ ষরবং ধৎব ঃৎঁব রং ৎিড়হম.” তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বড়রা যখন শিশুদের সামনে সত্য গোপন করে বা সাজানো মিথ্যা বলে, তখন তারা মূলত শিশুদের মনকে কলুষিত করে। ২। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (ডরষষরধস ডড়ৎফংড়িৎঃয) – ঙফব: ওহঃরসধঃরড়হং ড়ভ ওসসড়ৎঃধষরঃু রোমান্টিক কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বিশ্বাস করতেন, শিশুরা ঈশ্বরের কাছ থেকে স¤পূর্ণ পবিত্র ও স্বর্গীয় আলো নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু সে যত বড় হতে থাকে এবং বড়দের সং¯পর্শে আসে, পার্থিব জগতের নিয়ম, ছদ্মবেশ ও মিথ্যাচার তার সেই সরলতাকে গ্রাস করে ফেলে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি-"ঞযব ঈযরষফ রং ভধঃযবৎ ড়ভ ঃযব গধহ" - এর অন্তর্নিহিত অর্থও তাই, যেখানে শিশুর ভেতরের আদি সরলতাকেই মানুষের আসল রূপ বলা হয়েছে। ৩। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - “শিশু” কাব্যগ্রন্থ ও “খোকা” (নিন্দুক কবিতা) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিশুদের মনস্তত্ত্ব ও তাদের পবিত্রতা নিয়ে প্রচুর লিখেছেন। ‘নিন্দুক’ কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বড়রা নিজেদের জটিলতা দিয়ে শিশুর সরল আচরণকে বিচার করে। রবীন্দ্রনাথের দর্শন ছিল, শিশু কোনো পাপ বা মিথ্যা চেনে না; বড়দের সমাজই তাকে জগতের কৃত্রিমতা আর লোভ-লালসা ও মিথ্যার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ৪। সুকান্ত ভট্টাচার্য - “ছাড়পত্র” কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় শিশুর আগমনের কথা বলা হয়েছে। শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, সে একবারে নিষ্পাপ এবং অধিকার নিয়ে আসে। কিন্তু বড়দের তৈরি এই স্বার্থপর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজ তাকে নিজের মতো করে গড়ে তোলে, যেখানে তাকে টিকে থাকার জন্য বড়দের কাছ থেকে অন্যায় ও কপটতা শিখতে হয়। ৫। জীবনানন্দ দাশ - “আট বছর আগের একদিন” ও অন্যান্য কবিতা জীবনানন্দ দাশ তাঁর বিভিন্ন কবিতায় দেখিয়েছেন কীভাবে নাগরিক সভ্যতা বা বড়দের সমাজ মানুষের ভেতরের আদিম ও সরল সত্তাটিকে মেরে ফেলে। শিশুরা বড়দের জগতের কৃত্রিমতা দেখেই নিজেদের ভেতরের সত্যকে আড়াল করতে বাধ্য হয়। মূল দর্শন : এই সমস্ত কবিতার মূল কথা হলো- শিশুরা মূলত একটি ‘কোরা কাগজ’ বা ঞধনঁষধ জধংধ (স্বচ্ছ স্লেট)। বড়রা সেখানে যা লেখে, শিশু সেটাই শেখে। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে বড়দের মুখে মুখে বা আচরণে মিথ্যা ছড়াতে দেখেই শিশুরা নিজেদের রক্ষা করতে বা পরিস্থিতি সামাল দিতে মিথ্যা বলা শুরু করে। [লেখক : শেরগুল আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ]
এই গভীর জীবনদর্শনটি দেশী ও বিদেশী বহু কবির কবিতায় অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। কবিরা তাঁদের কবিতায় দেখিয়েছেন কীভাবে একটি শিশু নি®পাপ মন নিয়ে পৃথিবীতে আসে, আর আমাদের এই তথাকথিত ‘সভ্য’ ও ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ সমাজ তাকে ধীরে ধীরে কপটতা ও মিথ্যাচার শেখায়। নিচে দেশী ও বিদেশী কবিতার কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো, যেখানে এই দর্শনটি সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে: ১. বিদেশী কবি য়েভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কো (ণবামবহু ণবাঃঁংযবহশড়) “ঞবষষরহম খরবং ঃড় ঃযব ণড়ঁহম রং ডৎড়হম” রুশ কবি ইয়েভতুশেঙ্কোর সরাসরি বড়দের উদ্দেশ্য করে লিখেছেন যে, তরুণ বা শিশুদের কাছে মিথ্যা বলা এবং সেই মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা একটি অপরাধ। কবিতার কিছু অংশ এমন: “ঞবষষরহম ষরবং ঃড় ঃযব ুড়ঁহম রং ৎিড়হম. / চৎড়ারহম ঃড় ঃযবস ঃযধঃ ষরবং ধৎব ঃৎঁব রং ৎিড়হম.” তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বড়রা যখন শিশুদের সামনে সত্য গোপন করে বা সাজানো মিথ্যা বলে, তখন তারা মূলত শিশুদের মনকে কলুষিত করে। ২। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (ডরষষরধস ডড়ৎফংড়িৎঃয) – ঙফব: ওহঃরসধঃরড়হং ড়ভ ওসসড়ৎঃধষরঃু রোমান্টিক কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বিশ্বাস করতেন, শিশুরা ঈশ্বরের কাছ থেকে স¤পূর্ণ পবিত্র ও স্বর্গীয় আলো নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু সে যত বড় হতে থাকে এবং বড়দের সং¯পর্শে আসে, পার্থিব জগতের নিয়ম, ছদ্মবেশ ও মিথ্যাচার তার সেই সরলতাকে গ্রাস করে ফেলে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি-"ঞযব ঈযরষফ রং ভধঃযবৎ ড়ভ ঃযব গধহ" - এর অন্তর্নিহিত অর্থও তাই, যেখানে শিশুর ভেতরের আদি সরলতাকেই মানুষের আসল রূপ বলা হয়েছে। ৩। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - “শিশু” কাব্যগ্রন্থ ও “খোকা” (নিন্দুক কবিতা) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিশুদের মনস্তত্ত্ব ও তাদের পবিত্রতা নিয়ে প্রচুর লিখেছেন। ‘নিন্দুক’ কবিতায় তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বড়রা নিজেদের জটিলতা দিয়ে শিশুর সরল আচরণকে বিচার করে। রবীন্দ্রনাথের দর্শন ছিল, শিশু কোনো পাপ বা মিথ্যা চেনে না; বড়দের সমাজই তাকে জগতের কৃত্রিমতা আর লোভ-লালসা ও মিথ্যার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ৪। সুকান্ত ভট্টাচার্য - “ছাড়পত্র” কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় শিশুর আগমনের কথা বলা হয়েছে। শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, সে একবারে নিষ্পাপ এবং অধিকার নিয়ে আসে। কিন্তু বড়দের তৈরি এই স্বার্থপর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজ তাকে নিজের মতো করে গড়ে তোলে, যেখানে তাকে টিকে থাকার জন্য বড়দের কাছ থেকে অন্যায় ও কপটতা শিখতে হয়। ৫। জীবনানন্দ দাশ - “আট বছর আগের একদিন” ও অন্যান্য কবিতা জীবনানন্দ দাশ তাঁর বিভিন্ন কবিতায় দেখিয়েছেন কীভাবে নাগরিক সভ্যতা বা বড়দের সমাজ মানুষের ভেতরের আদিম ও সরল সত্তাটিকে মেরে ফেলে। শিশুরা বড়দের জগতের কৃত্রিমতা দেখেই নিজেদের ভেতরের সত্যকে আড়াল করতে বাধ্য হয়। মূল দর্শন : এই সমস্ত কবিতার মূল কথা হলো- শিশুরা মূলত একটি ‘কোরা কাগজ’ বা ঞধনঁষধ জধংধ (স্বচ্ছ স্লেট)। বড়রা সেখানে যা লেখে, শিশু সেটাই শেখে। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে বড়দের মুখে মুখে বা আচরণে মিথ্যা ছড়াতে দেখেই শিশুরা নিজেদের রক্ষা করতে বা পরিস্থিতি সামাল দিতে মিথ্যা বলা শুরু করে। [লেখক : শেরগুল আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ]