সত্যশব্দের অনন্য পরিবেশনা, ছয় ঋতু এক রবিরাগ

আপলোড সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ১০:০৮:২৭ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ১০:১০:৩০ পূর্বাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার::
বাংলার প্রকৃতি, ঋতুবৈচিত্র্য আর মানুষের জীবন - সবকিছুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টির সম্পর্ক যেন এক অবিচ্ছেদ্য সুরের বন্ধন। কখনো বর্ষার মেঘে, কখনো শরতের শুভ্রতায়, কখনো বসন্তের রঙে তিনি খুঁজে নিয়েছেন জীবনের সৌন্দর্য ও দর্শন। সেই রবীন্দ্রসৃষ্টির বহুমাত্রিকতাকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জে অনুষ্ঠিত হলো সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘ছয় ঋতু এক রবিরাগ’।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সোমবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাসন রাজা মিলনায়তনে এ আয়োজন করে সত্যশব্দ সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র। ছয় ঋতুর বৈচিত্র্য ও রবীন্দ্রসৃষ্টির অনুরণনকে একসূত্রে গেঁথে সাজানো হয় পুরো অনুষ্ঠান। এই আয়োজনে নৃত্যালেখ্যে ছিল না দীর্ঘ আলোচনা কিংবা আনুষ্ঠানিকতার ভার। গান, আবৃত্তি ও নৃত্যের সম্মিলিত পরিবেশনাই ছিল আয়োজনের মূল ভাষা। শ্রাবণের আবহ দিয়ে শুরু হওয়া সন্ধ্যায় উপস্থাপকের কণ্ঠে উঠে আসে কবিগুরুর চিরন্তন উপস্থিতির কথা- শরীরী অস্তিত্বের অবসান হলেও সৃষ্টির ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে বাঙালির আনন্দ-বেদনা, প্রেম, প্রকৃতি ও প্রার্থনার সঙ্গে আজও মিশে আছেন।

অনুষ্ঠানের সূচনাতেই ক্ষুদে শিল্পীদের নৃত্যে ফুটে ওঠে নবযৌবনের আবাহন। ‘আমরা নতুন যৌবনের দূত’ গানের সঙ্গে তাদের পরিবেশনা যেন নতুন দিনের দ্বার উন্মোচনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর আসে বৈশাখ। রুক্ষতা, তাপ আর কালবৈশাখীর দুরন্ত শক্তির মধ্য দিয়ে পুরোনোকে ঝেড়ে ফেলে নতুনকে বরণের আহ্বান। আবৃত্তি করা হয়- ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ!’। তার পরেই ‘দারুণ অগ্নিবাণেরে’ গানের নৃত্যপরিবেশনায় বৈশাখের রুদ্র ও দীপ্ত রূপ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। রুদ্র বৈশাখের পর প্রকৃতি বদলে নেয় তার ভাষা। আষাঢ়-শ্রাবণের মেঘে আকাশ ঢেকে যায়, নেমে আসে অবিরাম বর্ষণ। ‘গহন ঘন ছাইলো গগন ঘনাইয়া’ গানের নৃত্যের সঙ্গে আবৃত্তিতে উচ্চারিত হয়- ‘নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে/তিল ঠাঁই আর নাহি রে’। মেঘ, বৃষ্টি ও প্রকৃতির ব্যাকুলতা মিলেমিশে তৈরি করে বর্ষার এক মায়াময় আবহ। বর্ষার মেঘ সরে গেলে আসে শরৎ। নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা, পাকা ধানের গন্ধ আর নবান্নের প্রত্যাশায় প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে। ‘আজি কি তোমার মধুর মূরতি/হেরিনু শারদ প্রভাতে’ আবৃত্তির সঙ্গে ‘আজ ধানের ক্ষেতে’ গানের নৃত্য পরিবেশনায় ফুটে ওঠে বাংলার শ্যামল-সোনালী শরৎ। শরতের উৎসবমুখরতা পেরিয়ে আসে হেমন্তের ধীর, গম্ভীর ও প্রশান্ত রূপ। আবৃত্তিতে উঠে আসে- ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে’। শব্দহীন মাঠ, স্বর্ণশ্যাম ধান, ক্ষীণ নদীরেখা আর প্রকৃতির গভীর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে যেন শিল্পীরা দর্শকদের নিয়ে যান এক ধ্যানমগ্ন জগতে। এরপর ‘হায় হেমন্ত লক্ষ্মী তোমার নয়ন’ গানের নৃত্য পরিবেশনা সেই আবেশকে আরও গভীর করে। হেমন্তের পর প্রকৃতিতে নামে শীতের রিক্ততা। ঝরে পড়ে পাতা, থেমে যায় ফুলের বিকাশ, স্তব্ধ হয়ে আসে মলয় সমীরণ। ‘পাখি বলে আমি চলিলাম, ফুল বলে আমি ফুটিব না’ - এই আবৃত্তিতে শীতের বিষণœতা ও নিঃসঙ্গতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘শীতের হাওয়ায় লাগলো নাচন’ গানের নৃত্যপরিবেশনায় সেই শীতও পায় নিজস্ব ছন্দ। আর সব রিক্ততার অবসান ঘটিয়ে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। কিশলয়ের সবুজ, বকুলের গন্ধ, অশোকমঞ্জরির চঞ্চলতা আর নতুন প্রাণের উৎসব নিয়ে মঞ্চে আবির্ভূত হয় বসন্ত। ‘হে বসন্ত, হে সুন্দর’ আবৃত্তির পর ‘ঝর ঝর ঝরঝর ঝরে রঙের ঝরণা’ গানের নৃত্য পরিবেশনায় যেন রঙে-সুরে ভরে ওঠে পুরো মিলনায়তন। এভাবেই বৈশাখ থেকে শুরু করে বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত পেরিয়ে বসন্তে পৌঁছে আবার ঋতুচক্র ফিরে আসে শ্রাবণের কাছে। শেষ পর্বে ‘জয় তব বিচিত্র আনন্দ’ গানের সঙ্গে অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের সম্মিলিত পরিবেশনা হয়ে ওঠে কবিগুরুর প্রতি এক সমবেত প্রণাম। আয়োজকদের মতে, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি শুধু সাহিত্য বা সংগীতের বিষয় নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বাঙালির প্রকৃতি, জীবনবোধ, প্রেম, মানবতা ও দর্শন। সেই সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রভাবনাকে জীবন্ত রাখাই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। সত্যশব্দের পরিচালক ও আবৃত্তি প্রশিক্ষক দেবাশীষ তালুকদার শুভ্র এবং নৃত্য বিভাগের প্রশিক্ষক দেবপ্রিয়া পাল বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যের যে গভীর স¤পর্ক, তা গান, কবিতা ও নৃত্যের সম্মিলনে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

আয়োজনটির পরিকল্পনা, পান্ডুলিপি ও মঞ্চ পরিকল্পনায় ছিলেন দেবপ্রিয়া পাল। মঞ্চ অলংকরণে দেবাশীষ তালুকদার শুভ্র, মঞ্চ নির্মাণে তারা মিয়া এবং আলোক প্রক্ষেপণে ছিলেন সাইফুল ইসলাম। সত্যশব্দ সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের আয়োজনে অনুষ্ঠানটি সহযোগিতা করে জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও ফারিহা একাডেমি।
আলোচনা ও আনুষ্ঠানিকতার আনুষঙ্গিকতা বাদ দিয়ে শুধু শিল্পের ভাষায় কবিগুরুকে স্মরণ - এই ছিল ‘ছয় ঋতু এক রবিরাগ’-এর বিশেষত্ব। ফলে অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল কেবল প্রয়াণ দিবসের স্মরণানুষ্ঠান নয়, বরং বাংলার প্রকৃতি ও রবীন্দ্রসৃষ্টির এক নান্দনিক সংলাপ। ঋতুর বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাওয়া মঞ্চের আবহে দর্শকরাও যেন অনুভব করলেন- রবীন্দ্রনাথ চলে গেলেও তাঁর গান, কবিতা ও ভাবনার ভেতর দিয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন বাংলার প্রতিটি ঋতুতে, প্রতিটি সুরে, প্রতিটি হৃদয়ে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com