ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে সর্বস্বান্ত : দালালচক্রের লাগাম টানতেই হবে

আপলোড সময় : ০৫-০৮-২০২৬ ১২:৪৯:৫১ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৫-০৮-২০২৬ ১২:৪৯:৫১ পূর্বাহ্ন
বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন বাংলাদেশের বহু তরুণের। বিশেষ করে বেকারত্ব, সীমিত কর্মসংস্থান ও আর্থিক সংকটের কারণে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার আকাক্সক্ষা দিন দিন বাড়ছে। মানুষের এই স্বপ্ন ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একশ্রেণির দালাল ও প্রতারকচক্র। সুনামগঞ্জে ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে জাল ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ও বিমান টিকিট দেওয়ার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা তারই ভয়াবহ উদাহরণ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সিলেটের এক ব্যক্তি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে সুনামগঞ্জের একটি এলাকার অন্তত ১০ জনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন। তাদের কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউবা সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশ যাওয়ার আশায় টাকা দিয়েছেন। পরে তাদের কারও হাতে দেওয়া হয়েছে জাল ভিসা, কারও হাতে জাল ওয়ার্ক পারমিট কিংবা বিমান টিকিট। যাচাই-বাছাইয়ের পর এসব নথি জাল বলে ধরা পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর টাকা ফেরত না দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মগোপনে চলে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইউরোপের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামেও একই ধরনের প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসল নথির আদলে জাল ভিসা, টিকিট ও ওয়ার্ক পারমিট তৈরি করা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে আসল-নকল শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদেশ যাওয়ার প্রবল আকাক্সক্ষা ও দ্রুত সুযোগ পাওয়ার লোভে অনেকে যথাযথ যাচাই ছাড়াই দালালের হাতে জীবনের সঞ্চয় তুলে দিচ্ছেন। একজন মানুষ বিদেশে যাওয়ার জন্য যে অর্থ ব্যয় করেন, তা অনেক সময় তার পরিবারের বছরের পর বছর সঞ্চয়। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নেন, কেউ উচ্চ সুদে টাকা ধার করেন। সেই অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে হাতছাড়া হলে শুধু একজন ব্যক্তি নন, পুরো পরিবারই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঋণের বোঝা, পাওনাদারের চাপ, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা - সব মিলিয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় শুধু ভুক্তভোগীদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। প্রতারণার মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। দালালচক্রের স্থানীয় নেটওয়ার্ক, অর্থ লেনদেনের মাধ্যম এবং তাদের সহযোগীদেরও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে কারা বৈধভাবে ব্যবসা করছে, কারা অবৈধভাবে মধ্যস্থতা করছে - এ বিষয়ে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশগমনেচ্ছুদের জন্য সহজলভ্য ও কার্যকর তথ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি, চাকরির অফার, ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা ও টিকিট যাচাইয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রচারণা চালানো দরকার। বিদেশ যাওয়ার আগে কোথায় যাচাই করতে হবে, কোন কাগজপত্র ছাড়া টাকা দেওয়া যাবে না এবং প্রতারণার শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে - এসব তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি, টাকা প্রদানের রসিদ, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের কপি সংরক্ষণ করাও অত্যন্ত জরুরি। দালালের কথায় নগদ অর্থ তুলে দিয়ে পরে প্রতারণার শিকার হলে আইনি প্রতিকার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ‘আগে টাকা, পরে কাগজ’-এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সুনামগঞ্জের ঘটনাটি প্রশাসনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে ভুক্তভোগীদের অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও শনাক্ত করা জরুরি। কারণ একজন দালালকে গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; ভেঙে দিতে হবে পুরো প্রতারণার নেটওয়ার্ক। মানুষের বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন অপরাধ নয়; সেই স্বপ্নকে প্রতারণার হাতিয়ার বানানোই অপরাধ। তাই বিদেশে কর্মসংস্থানের আকাক্সক্ষাকে নিরাপদ ও বৈধ পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজ - সবার। সুনামগঞ্জে জাল ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রতারকদের জন্য কঠোর বার্তা। বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন যেন কারও সর্বস্ব হারানোর কারণ না হয় - এখনই দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com