ফেসবুকের ‘গেম’ নয়, এটি মৃত্যুর ফাঁদ মানবপাচার প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি

আপলোড সময় : ০১-০৮-২০২৬ ০৮:২৯:৩৯ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০১-০৮-২০২৬ ০৮:২৯:৩৯ পূর্বাহ্ন
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ও গ্রিসে পৌঁছানোর ‘স্বপ্ন’ নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই আকাক্সক্ষাকে কেন্দ্র করে যে ভয়ংকর মানবপাচার চক্র গড়ে উঠেছে, তা এখন বাংলাদেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। আরও উদ্বেগজনক হলো-এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় সুনামগঞ্জের লোকজনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় জড়িয়ে পড়ছেন। ফ্রন্টেক্সের তথ্য বলছে, অনিয়মিতভাবে ইতালি ও গ্রিসে প্রবেশকারী বাংলাদেশিদের সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এর পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র, যারা এখন প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফেসবুক, টিকটক কিংবা মেসেঞ্জারে ‘গেম’ নামে চালানো হচ্ছে মৃত্যুযাত্রার বিপণন। ইতালির সুন্দর শহর, সমুদ্রসৈকত কিংবা সফলতার গল্প দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। কিন্তু লিবিয়ার বন্দিশিবিরে নির্যাতন, মুক্তিপণের জন্য অমানবিক অত্যাচার কিংবা ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর করুণ বাস্তবতা ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হচ্ছে। সুনামগঞ্জের জন্য এই সংকট আরও বেদনাদায়ক। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিসগামী নৌকায় অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে, মানবপাচারের ভয়াবহ মূল্য সবচেয়ে বেশি দিচ্ছে আমাদের জেলার মানুষ। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত। হাওরাঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে বিষয়টি আরও ¯পষ্ট হয়। মৌসুমি কর্মসংস্থান, সীমিত শিল্পায়ন, পর্যাপ্ত চাকরির অভাব এবং বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলের আকাক্সক্ষা - এসব কারণে অনেক তরুণ সহজেই দালালচক্রের টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। কেউ জমি বিক্রি করছেন, কেউ সুদে ঋণ নিচ্ছেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে এই অনিশ্চিত যাত্রায় নামছেন। কিন্তু ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছানোর আগেই অনেকের ভাগ্যে জুটছে লিবিয়ার বন্দিশিবির, নির্যাতন কিংবা সাগরে মৃত্যু। দুঃখজনক হলেও সত্য, মানবপাচার এখন আর শুধু সীমান্তপথের অপরাধ নয়; এটি ডিজিটাল অপরাধেও রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত অসংখ্য গ্রুপ ও পেজের মাধ্যমে পাচারকারীরা প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি, ভুয়া সফলতার গল্প প্রচার, কৃত্রিম মন্তব্যের মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি - সবই একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার অংশ। এই চক্রের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। মানবপাচার প্রতিরোধে কেবল প্রশাসনিক অভিযান যথেষ্ট নয়। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন এবং জনপ্রতিনিধিদের স¤পৃক্ত করে নিয়মিত প্রচারণা চালাতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিদেশগমনের প্রবণতা বেশি, সেখানে পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ জরুরি। বিদেশে বৈধ শ্রম অভিবাসনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মামলার সংখ্যা বাড়লেই হবে না; দ্রুত তদন্ত, বিচার এবং সাজা কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের কাছে কঠোর বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। পাশাপাশি মানবপাচারের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, মানসিক সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত। সুনামগঞ্জের বাস্তবতায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হতে পারে। হাওরভিত্তিক কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো গেলে বিদেশে অবৈধ পথে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তরুণদের যদি নিজ জেলায় সম্মানজনক আয়ের সুযোগ তৈরি হয়, তবে তারা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে দালালের প্রলোভনে পা দেবেন না। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন অপরাধ নয়; কিন্তু সেই স্বপ্ন যদি প্রতারণা, নির্যাতন ও মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়, তবে তা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। ফেসবুকের তথাকথিত ‘গেম’ কোনো খেলা নয় - এটি জীবনের সঙ্গে নির্মম প্রতারণা। যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না করে, আর কোনো পরিবার যেন লিবিয়ার বন্দিশিবির থেকে মুক্তিপণের ফোন না পায় কিংবা ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে প্রিয়জনকে হারাতে না হয় - সেই লক্ষ্যেই এখনই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com