সুনামগঞ্জে মাদকের বিস্তার, বিশেষ করে ইয়াবার ভয়াবহ প্রসার, শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি এখন জনস্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। একসময় শহরকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসা এখন গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে তরুণ সমাজ, যারা সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন কিংবা কৌতূহলবশত মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাদক ব্যবসা এখন সংঘবদ্ধ চক্রের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা, আন্তঃজেলা যোগাযোগ এবং বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে মাদক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে- এমন অভিযোগ স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার করছে, কিন্তু শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং এর পেছনের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
মাদকের বিস্তারের সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা, কিশোর অপরাধ এবং সামাজিক অস্থিরতার মতো নানা সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। একটি পরিবারে একজন মাদকাসক্ত সদস্য পুরো পরিবারকে অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে ফেলে দিতে পারে। ফলে বিষয়টিকে কেবল অপরাধ দমনের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে মাদক নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারি, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং তথ্যভিত্তিক অভিযান জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, অভিভাবক এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সচেতনতা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও মাদক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মাদকাসক্তদের ক্ষেত্রে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগও। কারণ একজন আসক্তকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে না পারলে সমাজে অপরাধের ঝুঁকি থেকেই যায়।
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও অপরিহার্য। গোপন তথ্য প্রদানকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিকভাবে মাদকবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সুনামগঞ্জের মতো সীমান্তবর্তী জেলায় মাদকের বিস্তার রোধে এখনই কার্যকর, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। কারণ মাদকের কাছে একটি প্রজন্মকে হারিয়ে ফেলার মূল্য কোনো সমাজই বহন করতে পারে না। আজকের দৃঢ় অবস্থানই আগামী দিনের সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের ভিত্তি হতে পারে।