হাওর-নদী হারাচ্ছে পানি ধারণ ক্ষমতা, বাড়ছে অকাল বন্যার শঙ্কা

আপলোড সময় : ১৮-০৭-২০২৬ ১০:৫০:২৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৮-০৭-২০২৬ ১০:৫১:০৫ পূর্বাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার::
হাওরাঞ্চলের নদ-নদী ও খাল-বিল দ্রুত ভরাট হয়ে যাওয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখে পড়েছে। পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলেই সৃষ্টি হচ্ছে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি। এতে প্রতিবছরই ঝুঁকিতে পড়ছে বোরো ফসল, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, মৎস্যস¤পদ, নৌযোগাযোগ ও জীববৈচিত্র্য। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), হাওর গবেষক ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার - এই সাত জেলার প্রায় ৬০টি উপজেলার প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষিনির্ভর। একসময় এ অঞ্চলে ছোট-বড় প্রায় ৩৫৪টি নদী ছিল। বর্তমানে পলি জমা, অবৈধ দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে প্রায় ৩০০টি নদী নাব্যতা হারিয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় তিন হাজার খাল-বিলও ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়া সীমান্ত থেকে নেমে আসা ২২টি আন্তঃসীমান্ত নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় পানিপ্রবাহ আরও সংকুচিত হয়ে থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী ও খালের তলদেশ ভরাট হওয়ায় হাওর তার স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড়ি ঢল দ্রুত হাওরে নেমে আসে। কয়েক দিনের মধ্যেই ফসলি জমি তলিয়ে যায়, জনপদ প্লাবিত হয়। সম্প্রতি পাহাড়ি ঢলে তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রাম ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আকস্মিক ঢলের তোড়ে অনেকের বসতঘর ও দোকানপাট ভেঙে গেছে। একই সঙ্গে ঢলের পানিতে ভেসে আসা বালুতে সীমান্ত সংলগ্ন বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ভরাট হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রায় দেড়শ একর ফসলি জমি, ২৫ থেকে ৩০টি ঘরবাড়ি এবং এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্কুলের ক্ষতি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার অন্যতম কারণ ছিল নদীর নাব্যতা হ্রাস। এ অবস্থায় প্রতিটি বর্ষা মৌসুমে একই আশঙ্কা ঘিরে ধরে হাওরবাসীকে। পাউবো সূত্র জানায়, তিন বছর আগে পানিস¤পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৪৩টি নদীর ৯২৫ কিলোমিটার খননের প্রস্তাব পাঠানো হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ‘হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন প্রকল্প’-এর আওতায় ছয়টি নদী খননে ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। রক্তি, বৌলাই, যাদুকাটা, পুরান সুরমা, চামতি ও নলজুর নদীর বিভিন্ন অংশে খননকাজ পরিচালিত হলেও প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি। চলতি বছর খাল খননকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন কর্মসূচিও শুরু করেছে সরকার। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাওরের বিভিন্ন এলাকায় নদী ও খালের ওপর স্থায়ী বাঁধ, সড়ক এবং বাজার নির্মাণের কারণে অনেক জলপথের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। তাহিরপুরের কালাগাঙ, মনাই ও সরমরা নদী, পাটলাই নদীর খালগাঙ, সুনামগঞ্জ সদরের একাধিক খাল এবং ছাতকের বোকা নদীসহ অনেক নদী-খাল এখন প্রায় মৃতপ্রায়। তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া এলাকার বাসিন্দা কৃপেশ চক্রবর্তী বলেন, পাহাড়ি ঢল এসে বড়ছড়া খাল ভরাট করে দিয়েছে। কৃষিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কামারগাঁও গ্রামের কৃষক মমিন মিয়া বলেন, ছোটবেলায় দেখেছি নদী ছিল অনেক গভীর। বড় বড় নৌকা চলতো। এখন সেখানে গরু ঘাস খায়। প্রাণ-প্রকৃতি গবেষক পাভেল পার্থ জানান, উজানে মেঘালয়ে বন উজাড়, খনিজ উত্তোলন ও পাহাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংস যেমন নদীতে অতিরিক্ত পলি জমার কারণ, তেমনি ভাটিতে অপরিকল্পিত সড়ক, বাঁধ, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন এবং দখলও নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করছে। তার মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় নানিদ, লোচ, মহাশোল, পিপলিশোল, তারাবাইন, রানী ও বাঘাইড়সহ দেশীয় মাছের আবাস ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি হিজল-করচের জলাবন, গভীর পানির ধান এবং হাওরের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বলেন, শুধু নদী নয়, হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোও পরিকল্পিতভাবে পুনঃখনন করতে হবে। অন্যথায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। হাওরের জীববৈচিত্র্য বিষয়ক গবেষক কল্লোল তালুকদার চপল জানান, হাওরাঞ্চলের নদ-নদী ও খাল ভরাটের ফলে হাওরের মাটির উর্বরতা ও প্রতিবেশও নষ্ট হচ্ছে। পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষি ও বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সময় এই প্রভাব আমাদের জন্য আগামীতে চরম সংকট ডেকে আনবে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com