সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
রাজধানী ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নেওয়া ‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা ধরনের সংকটের তথ্য উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সাসেক (সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন) ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় শেষ হলেও ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২১ শতাংশ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে মূল সড়কের অগ্রগতি সাড়ে ১১ শতাংশ, সার্ভিস লেনের অগ্রগতি ১৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ আর সেতুর অগ্রগতি ৩১ দশমিক ১৪ শতাংশ।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নকশায় ত্রুটি ও পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন অপসারণ, আগের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক, সাইট হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা, বহুস্তরীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া, আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে এই প্রকল্পের কাজে। এর সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতার অভাবও দেখা গেছে।
জানা গেছে, এই মেগা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। ১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯.৩২৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, দুপাশে সার্ভিস লেন নির্মাণ, সেতু, কালভার্ট ও ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণ ও অবমুক্তির হার মাত্র ৩৭.৬১ শতাংশ হওয়ায় এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস লাইন স্থানান্তরের ধীরগতির কারণে ঠিকাদাররা পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না। তিতাস গ্যাস পাইপলাইন স্থানান্তরের অগ্রগতি মাত্র ০.৭৮ শতাংশ এবং জালালাবাদ গ্যাস লাইনের অগ্রগতি ১৫.৬৮ শতাংশ, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত বছর আগের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সঙ্গে বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির অসামঞ্জস্য, সড়কের নিচে দুর্বল মাটির উপস্থিতি, দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদনে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ এবং ঠিকাদারদের আর্থিক সংকট প্রকল্পের ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। দরপত্র আহ্বান থেকে চুক্তি স¤পাদন পর্যন্ত সময় লেগেছে ১১ থেকে ১৯ মাস।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-সিলেট করিডর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে একাধিক প্রশাসনিক, কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার কারণে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জিত হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শাখায় জনবল সংকট, কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ এবং ক্ষতিপূরণ নিয়ে আপত্তির কারণে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বারবার বিলম্বিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন ও মামলা-মোকদ্দমার কারণে চূড়ান্ত জমি হস্তান্তর দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে ঠিকাদারদের কাজ শুরু বা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
অন্যদিকে, কিছু লটে পর্যাপ্ত সাইট হস্তান্তর হওয়া সত্ত্বেও কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের আর্থিক সক্ষমতা, সাইট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে প্রকল্প বিলম্বের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে নকশা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় আগে করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সঙ্গে বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির অসামঞ্জস্যের কারণে নতুন ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস সংযোজন, সড়কের অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুনঃনকশা করতে হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের জন্য বহুমাত্রিক অনুমোদন প্রক্রিয়া স¤পন্ন করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট অংশে নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
সমীক্ষা বলছে, মহাসড়কটিকে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ করিডোরে রূপান্তরের লক্ষ্যে নতুন করে ব্যাপক ‘সেফটি ইন্টারভেনশন’ যুক্ত করায় নির্মাণকাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
প্রাথমিক নকশায় বাদ পড়া ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস পুনরায় সংযোজনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বর্তমানে ৯টি ফ্লাইওভার, ৪২টি লাইট ভেহিকুলার আন্ডারপাস, ২২টি ভেহিকুলার আন্ডারপাস এবং ৭৭টি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা যুক্ত হয়েছে। এসব পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও চলমান কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
প্রকল্পের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে দুর্বল ভূগর্ভস্থ মাটি। বিশেষ করে কিছু অংশে মাটির ভারবহন ক্ষমতা অত্যন্ত কম হওয়ায় ব্যাপক গ্রাউন্ড ইম্প্রুভমেন্ট, সাবগ্রেড পরিবর্তন এবং নকশা সংশোধনের প্রয়োজন হচ্ছে। এই অতিরিক্ত কারিগরি প্রক্রিয়া ও অনুমোদন নিতে সময় লাগায় নির্মাণকাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
এদিকে কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট, পর্যাপ্ত নির্মাণসামগ্রীর ঘাটতি এবং ভারী যন্ত্রপাতির স্বল্পতাও কাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। মাঠ পর্যায়ে সাইট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নির্ধারিত কাজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার চিত্রও উঠে এসেছে।