সুনামগঞ্জ নামকরণ : দলিলভিত্তিক পুনর্বিবেচনা

আপলোড সময় : ১৩-০৭-২০২৬ ০৯:১৩:৪৬ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৩-০৭-২০২৬ ০৯:১৪:২৮ পূর্বাহ্ন
শেখ একেএম জাকারিয়া::
(পূর্ব প্রকাশের পর)
সব মিলিয়ে, তাঁর ইতিহাসচর্চা যেন একপাশে ঝুঁকে থাকা একটি সেতুর মতো; যার এক প্রান্ত সু¯পষ্টভাবে দৃশ্যমান, আর অন্য প্রান্ত কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে গেছে। ফলে পাঠক স¤পূর্ণ ইতিহাসের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই একটি নির্বাচিত ইতিহাসের চিত্রের মধ্য দিয়েই পথ চলতে বাধ্য হন। যাই হোক, ফারুকুর রহমান চৌধুরী তাঁর দিরাই উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গ্রন্থের ফুটনোটে লিখেছেন যে, মুরাদপুরের চৌধুরীগণ একটি কুর্সিনামা পাঠিয়েছেন। কুর্সিনামায় উল্লেখ আছে যে, মহারাজ জগদীশ সিং-এর পুত্র মহারাজ সুনামদি সিং-এর নামানুসারেই সুনামগঞ্জের নামকরণ হয়েছে। তিনি সুরমা নদীর তীরে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে সুনামদি সিং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে শরীফ খাঁ নাম ধারণ করেন। এই শরীফ খাঁর অধস্তন মো. ছাবি ও মো. রবির নামে বেতাল খালিসা পরগণার ১ নম্বর ও ৩৫ নম্বর তালুক বন্দোবস্ত হয়েছিল। সুনামগঞ্জের নামকরণ সম্পর্কে এ ধরনের আরও নানা মত ও বর্ণনা প্রচলিত আছে। কিন্তু মানচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। ইতিহাসবিদদের আলোচিত অষ্টাদশ বা ঊনবিংশ শতকের সুনামদি-সংক্রান্ত জনশ্রুতি ও কাহিনীগুলোর সঙ্গে সুনামগঞ্জ নামকরণের স¤পর্ক থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কারণ, তাঁদের অস্তিত্বের বহু পূর্বেই ১৬৬০ সালের শ্রীহট্টের প্রাচীন মানচিত্রে ‘সুনামগঞ্জ’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিশোর মানচিত্র ম্যাগাজিনেও সুনামগঞ্জ নামকরণের সঙ্গে সপ্তদশ শতকের মুসলিম সুনামদির সম্পর্কের কথা উল্লেখ রয়েছে। সম্ভবত, কিশোর মানচিত্র-এ উল্লিখিত সেই সুনামদি এবং গবেষক এএসএম ওয়াজেদের মতে, ১৯৫৮ সালে আল-ইসলাহ পত্রিকায় প্রকাশিত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর নবম অধস্তন পুরুষ শেখ সুনাম উদ্দিন, ওরফে সুনামদি, একই ব্যক্তি। প্রজন্মপ্রতি গড়ে প্রায় ৩৫-৩৮ বছর ধরে হিসাব করলে, হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর জন্মকাল যদি আনুমানিক ১২৭৫ সালের দিকে হয় এবং তাঁর প্রথম অধস্তন পুরুষের জন্ম যদি ১৩১০ সালের দিকে হয়ে থাকে, তবে তাঁর নবম অধস্তন পুরুষ শেখ সুনাম উদ্দিনের জন্মকাল আনুমানিক ১৬০০ সালের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। এই সময়কাল ১৬৬০ সালের মানচিত্রে ‘সুনামগঞ্জ’ নামের উপস্থিতির সঙ্গেও কালানুক্রমিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তা ছাড়া, ‘ভূমি সনদ পরিচিতি’ গ্রন্থে সংরক্ষিত ছনখাইর ও সংশ্লিষ্ট পরগণার বিভিন্ন সনদ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ও ভূমি-ঐতিহাসিক ধারার সন্ধান পাওয়া যায়, যা শেখ সুনাম ফকির বা সুনামদি পরিবারের অবস্থান ও উত্তরাধিকারের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গ্রন্থের ক্রমিক নং ১৮২-এ উল্লেখিত সনদে দেখা যায়, শেখ বিরাহিম, পিতা শেখ সুনাম ফকির, ছিলেন সনদের গ্রহীতা। সনদের দাতা ছিলেন সিকন্দর গং। সনদের কোড নং কিউ-২৬৭/২৯৩ এবং তারিখ ৭ শাবান, ১০৯৭ হিজরি। এতে ছনখাইর পরগণায় পরগণাপতি সনদের আওতায় হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর নামে ৬ কেদার চেরাগি ভূমির উল্লেখ রয়েছে। একই গ্রন্থের ক্রমিক নং ১৮৪-এ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সনদের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে শেখ গয়াছদি ফকির, যিনি শেখ সুনামদি ফকিরের পিতা, সনদের গ্রহীতা হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছেন। সনদের কোড নং কিউ-২৬৯/২৯৫ এবং তারিখ ১২ শ্রাবণ, ১২৩০ বঙ্গাব্দ। এতে দাতার স্থানে “সুরতহাল” শব্দটি উল্লেখ রয়েছে। সনদে উল্লিখিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে ধারণা করা যায় যে, গয়াছদি ফকির পূর্ব থেকেই জমিটির দখলদার বা ভোগকারী ছিলেন। পরবর্তীকালে কোনো জরিপ, বন্দোবস্ত বা সনদ প্রদানের সময় তাঁর বিদ্যমান দখলকে স্বীকৃতি দিয়ে জমিটি তাঁর নামে নথিভুক্ত করা হয়। সম্ভবত এ কারণেই দাতার স্থানে কোনো ব্যক্তির নামের পরিবর্তে “সুরতহাল” (বর্তমান অবস্থা বা বিদ্যমান দখল) শব্দটি লেখা হয়েছে। এ থেকে আরও ধারণা করা যায় যে, যেসব গ্রহীতার নামের পূর্বে দাতার স্থানে “সুরতহাল” উল্লেখ রয়েছে, তাঁরা পূর্ব থেকেই সংশ্লিষ্ট ভূমি ভোগদখল করে আসছিলেন। এমনও হতে পারে যে, ভূমিগুলো ‘মাদদ-ই-মাশ’ বা অনুরূপ কোনো নিষ্কর ভূস¤পত্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই দুটি প্রাচীন সনদ একত্রে বিশ্লেষণ করলে একটি প্রাথমিক বংশধারার সন্ধান পাওয়া যায়, শেখ গয়াছদি ফকির ↓ শেখ সুনাম ফকির ↓ শেখ বিরাহিম এর পাশাপাশি, গ্রন্থের অন্যান্য সনদ থেকেও শেখ সুনামদি ফকিরের আরও কয়েকজন উত্তরাধিকারের পরিচয় পাওয়া যায়, যা তাঁর পরিবারের বিস্তৃত উপস্থিতি ও উত্তরাধিকারকে নির্দেশ করে। এর মধ্যে ক্রমিক নং ২১৩-এ উল্লেখিত সনদটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এতে শেখ বাহাদুর, পিতা দৌলত খাঁ, ভূমিদাতা হিসেবে উল্লেখিত হয়েছেন এবং গ্রহীতা ছিলেন শেখ মাজু, পিতা শেখ সুনাম ফকির। সনদের কোড নং আর-১২৫, তারিখ ২২ চৈত্র, ১১৭২ সাল। এতে চেরাগি হিসেবে ১ খিত্তা ভূমি দানের তথ্য পাওয়া যায়। এই সনদটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে শেখ সুনাম ফকিরের আরেক পুত্র শেখ মাজুর নাম স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। পূর্ববর্তী সনদে শেখ বিরাহিমের নাম পাওয়া গিয়েছিল। ফলে বোঝা যায় যে, শেখ সুনাম ফকিরের একাধিক পুত্র ছিলেন, যাঁদের মধ্যে অন্তত শেখ বিরাহিম ও শেখ মাজুর নাম দলিলভুক্তভাবে প্রমাণিত। এছাড়া, একই গ্রন্থে সংরক্ষিত আরও একটি সনদে মো. আমিন, পিতা শেখ সুনাম ফকির, গ্রহীতা হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়েছেন। সনদের কোড নং আর-১৩৪ এবং তারিখ ১৭ কার্তিক, ১১৯৩ সাল। এই দলিলটিও ভূমি-সনদের ধারাবাহিকতায় শেখ সুনাম ফকির পরিবারের উপস্থিতির প্রমাণ বহন করে। এদিকে, ১৬৬১ সনের একটি পাট্টা দলিলেও শেখ ইয়াজদি ও শেখ আরবদি, পিতা শেখ সুনামদি, নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। দলিলে পরগণা আতুয়াজান এবং মৌজা জামার গাঁও (বর্তমান দাওরাই গ্রাম) উল্লেখ রয়েছে। এসব দলিল একত্রে বিশ্লেষণ করলে শেখ সুনামদি ফকিরের সম্ভাব্য উত্তরাধিকার কাঠামো নি¤œরূপ দাঁড়ায়, শেখ গয়াছদি ফকির ↓ শেখ সুনাম ফকির (সুনামদি) ↓ শেখ বিরাহিম ( বিরামদি) শেখ মাজু মো. আমিন শেখ আরবদি শেখ ইয়াজদি সব মিলিয়ে, ‘ভূমি সনদ পরিচিতি’ গ্রন্থে সংরক্ষিত এসব সনদ ছনখাইর ও পার্শ্ববর্তী পরগণায় সুনামদি বা শেখ সুনাম ফকির পরিবারের উপস্থিতি, তাঁদের পারিবারিক ধারাবাহিকতা এবং চেরাগি ভূমির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের একটি সুসংগঠিত ঐতিহাসিক চিত্র উপস্থাপন করে। একই সঙ্গে, এসব দলিল স্থানীয় সমাজে ভূমি বন্দোবস্ত, চেরাগি ভূমি এবং দান-প্রথার দীর্ঘ ঐতিহ্যও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। পরিশেষে, এইটুকুই বলা যায় যে, সুনামগঞ্জ নামকরণ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা জনশ্রুতি ও মতভেদ প্রচলিত থাকলেও প্রাচীন মানচিত্র, ভূমি-সনদ, পাট্টা, তৌজি, খতিয়ান এবং স্থানীয় ঐতিহাসিক উপাদানের সমন্বিত বিশ্লেষণে একটি সুস্পষ্ট ধারা লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন দলিলে সুনামদি, সুনাম উদ্দিন, শেখ সুনাম ফকির এবং তাঁর উত্তরাধিকারীদের নামের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এ অঞ্চলে তাঁদের বংশের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ও সামাজিক অবস্থান ছিল। বিশেষ করে দাওরাই, জামার গাঁও, ছনখাইর, চামতলা (বনগাঁও), লক্ষ্মণছিরি এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রাপ্ত দলিলসমূহ এই পরিবারের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। গবেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর অধস্তন বংশধর শেখ সুনাম উদ্দিন, ওরফে সুনামদি, যিনি আনুমানিক সপ্তদশ শতকের প্রথম ভাগে জীবিত ছিলেন, তিনিই সেই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যার নামানুসারে পরবর্তীকালে সুনামগঞ্জের নামকরণ হয়েছে। বিভিন্ন দলিলে সুনামদি ও তাঁর বংশধরদের নামের ধারাবাহিক উপস্থিতি, স্থানীয় স্মৃতিচিহ্ন, ভৌগোলিক পরিচিতি এবং আঞ্চলিক ঐতিহ্য এই মতকে শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে। ফলে, সুনামগঞ্জ নামকরণের ক্ষেত্রে সুনামদিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যাখ্যাটি কেবল লোকমুখে প্রচলিত কোনো কিংবদন্তি নয়; বরং দলিলভিত্তিক ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের আলোকে এটি অধিক গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। যদিও ইতিহাসচর্চায় নবউদ্ধারকৃত প্রাচীন দলিল ও নতুন তথ্য আবিষ্কারের সুযোগ সবসময়ই উন্মুক্ত থাকে, তথাপি বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় যে, হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর বংশধর শেখ সুনাম উদ্দিন (সুনামদি)-এর নাম থেকেই ‘সুনামগঞ্জ’ নামের উৎপত্তি হয়েছে-এ মতটিই বর্তমানে সবচেয়ে সুসংহত, শক্তিশালী এবং গবেষণাসমর্থিত অবস্থান। [সমাপ্ত] তথ্যসূত্র : ১. এএসএম ওয়াজেদ (সংগৃহীত), সুনামগঞ্জ নামকরণ, সুনামদি ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক উপাদান। ২. এএসএম ওয়াজেদ (সংগৃহীত), প্রাচীন ভূমি-সনদ, স্থানীয় ঐতিহ্য ও সুনামদি-সম্পর্কিত গবেষণা-উপাত্ত। ৩. এএসএম ওয়াজেদ (সংগ্রহ), ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দের প্রাচীন মানচিত্রের অনুলিপি ও ব্যাখ্যামূলক তথ্য। ৪. এএসএম ওয়াজেদ (সংকলিত), হযরত শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) থেকে শেখ সুনাম উদ্দিন পর্যন্ত বংশতালিকা; আল-ইসলাহ (১৯৫৮)-এর আলোকে। ৫. নাসীর উদ্দীন আহমদ বিদ্যাভূষণ, হজরত শাহ দাওর বখশ খতীব (১৯৮৫)। ৬. সামারিন দেওয়ান, হাসন রাজার জীবন ও কর্ম, পৃ. ৪২১। ৭. সিলেট ভূমি রেকর্ডরুম, তৌজি দলিল (১৮৬১-১৮৬২), মহাল নং ২৪৬১০। ৮. আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন, সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য (১৯৯৫)। ৯. অচ্যুতচরণ চৌধুরী, শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত। ১০. শারমিন জাহান, কিশোর মানচিত্র। ১১. প্রাচীন ভূমি সনদ পরিচিতি; ছনখাইর ও সংশ্লিষ্ট পরগণার সনদসমূহ। ১২. ফারুকুর রহমান চৌধুরী, দিরাই উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ১৩. মোহাম্মদ মুমিনুল হক, রাজনগরের ইতিবৃত্ত। ১৪. কালিদহ সাগর ও লাউড় ইতিকথা (যন্ত্রস্থ)। ১৫. রহমতপুরের ইতিবৃত্ত (যন্ত্রস্থ)।
শেষ পর্ব

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com