শেখ একেএম জাকারিয়া::
(পূর্ব প্রকাশের পর)...
গবেষক সামারিন দেওয়ান রচিত হাসন রাজার জীবন ও কর্ম গ্রন্থের ৪২১তম পৃষ্ঠায় “সাবেক চৌধুরীগণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (বই নং ১)” অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দশসনা বন্দোবস্তের সময় লক্ষ্মণছিরি পরগণায় মোট ১২টি তালুক ছিল।” এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য। তবে তিনি দশসনা বন্দোবস্তের সময়ে সুনামদি নামে ১২ নম্বর তালুকের যে উল্লেখ করেছেন এবং সুনামদিকে ঘিরে যে ইতিহাস তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি ও দলিলগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আরও গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সামারিন দেওয়ান তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সুনামদি ছিলেন গভর্নমেন্ট-প্রেরিত খাসিয়া দমনকারী সেনাপতি মির্জা মুরাদ বেগের অনুচর। ১২ নম্বর তালুকটি ছিল অতীব দুর্গম ও জঙ্গলময়। ফলে লক্ষ্মণছিরির অন্যান্য মিরাসদারগণ এই জমির বন্দোবস্তে আগ্রহী হননি। এই সুযোগে মির্জা মুরাদ বেগ তাঁর অনুচর সুনামদিকে দিয়ে জমির বন্দোবস্ত করিয়ে সেখানে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। একটি বিষয়ে সবারই অবগত থাকা উচিত যে, সিলেট ভূমি রেকর্ডরুমে সংরক্ষিত দশসনা বন্দোবস্তের তৌজি দলিলে ২৪৬১০ নম্বর মহালের ক্ষেত্রে বন্দোব্সতগ্রহীতা কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায় না। সিলেট ভূমি রেকর্ডরুমে তল্লাশি করে জানা যায় যে, ১৮৬১ বা ১৮৬২ সালের তৌজি দলিলে মহাল নম্বর ২৪৬১০-এ “সুনামদি” না লিখে “সুনামগঞ্জ” লেখা হয়েছে। অথচ অন্যান্য মহালে ব্যক্তিনামের মাধ্যমে বন্দোবস্ত লিপিবদ্ধ রয়েছে। উক্ত মহালে “সুনামগঞ্জ” নামটি উল্লেখ থাকায় অনুমান করা যায় যে, এটি পূর্ব থেকেই সম্ভবত সুনাম উদ্দিনের মহাল বা তাঁর অধীনস্থ অঞ্চল ছিল। পরবর্তী সময়ে সুনাম উদ্দিন অনুপস্থিত থাকায় ১৭৮৯ সালের দশসনা বন্দোবস্তের সময় ওই অঞ্চল বা মহালটি “সুনামগঞ্জ” নামে তৌজিতে লিপিবদ্ধ করা হয়ে থাকতে পারে। মোহনপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত রহমতপুর গ্রামের বাসিন্দা রহমত আলি তাং-এর ১৮৬২ সালের তৌজি দলিল পাঠোদ্ধারে জানা যায় যে, থাক নং ২৮২৪, পরগণা লক্ষ্মণছিরি, মৌজা দ্বিতীয় খ- দারারগাঁও, মৌপ্রং, মৌজে ঢাকুয়ার হাওর, রহমতনগর ওরফে রহমতপুর, মোহনপুর, জয়নগর, সরদারপুর, আহমদপুর ও সাখাইতির উল্লেখ রয়েছে। তৌজিতে মহাল নম্বর ২৪৬০৯, রহমত আলি তাং (দশসনা) হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। এ মহালের হালমালিক হিসেবে মাং ছবদার, বলু কিয়ামদি প্রমুখের নামও উল্লেখ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, রহমত আলি তাং-এর দশসনা বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত তৌজি দলিলের একটি স্থানে “তৌজি লিখিত মহাল নম্বর ২৪৬০৯, রহমত আলি তাং, দশসনা” উল্লেখ রয়েছে। অথচ ২৪৬১০ নম্বর মহালের দশসনা দলিলের একই স্থানে “সুনামদি” বা “সুনাম উদ্দিন” লেখা হয়নি; বরং সেখানে “তৌজি লিখিত মহাল নম্বর ২৪৬১০, সুনামগঞ্জ, দশসনা” লেখা রয়েছে। এ থেকে আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ২৪৬১০ নম্বর মহালটি ১৭৮৯ সালে কোনো স্বতন্ত্র ব্যক্তির নামে বন্দোবস্ত হয়নি। বরং ১৬৬০ সালের পূর্বেই যে নাম অনুসারে “সুনামগঞ্জ”-এর নামকরণ হয়েছিল, দশসনা বন্দোবস্তের সময় সেই নামেই মহালটি তৌজিতে লিপিবদ্ধ করা হয়। হতে পারে, এই দশসনা বন্দোবস্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন মির্জা মুরাদ বেগ, যার কথা গবেষক সামারিন দেওয়ান তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। দাওরাই গবেষক এএসএম ওয়াজেদের মতে, ১৬৬০ সালের পূর্বেই সুনামগঞ্জ নামকরণ হওয়ায় ১৭৮৯ সালে এসে শেখ সুনাম উদ্দিনকে আর পাওয়া যায়নি। তাই উক্ত মহালের নাম “সুনামগঞ্জ” লেখা হয়েছে। তাঁর মতে, পূর্ববর্তী লেখকেরা সুনাম উদ্দিনকে নিয়ে যে ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন, তা সঠিক নয়; বরং তা বিকৃত ইতিহাস। তবে এটিও সত্য যে, সুনামগঞ্জ নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ তাঁদের গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। ইতিহাসবিদ আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন তাঁর “সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য” গ্রন্থে লিখেছেন, মোগল সিপাহি সুনাম উদ্দিনের নামেই সুনামগঞ্জের নামকরণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সুনামগঞ্জ নামকরণের সঙ্গে যুক্ত শেখ সুনাম উদ্দিন, ওরফে সুনামদি, কোনো সিপাহি ছিলেন না। ১৬৬০ সালের মানচিত্রে বর্তমান জগন্নাথপুর থানার পূর্বাঞ্চল ‘আতুয়াজান পরগণা’ নামে পরিচিত ছিল। অন্যদিকে, বর্তমান সুনামগঞ্জ সদর এলাকার লক্ষ্মণছিরি ও চামতলা (বনগাঁও) পরগণা অঞ্চল ‘সুনামদি মহাল’, ‘সুনামগঞ্জ পরগণা’ বা ‘সুনামগঞ্জ মহাল’ নামে পরিচিত ছিল। এ অঞ্চলের পরগণাপতি ছিলেন শেখ সুনাম উদ্দিন, যিনি একজন সুফি সাধক ও দরবেশ হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষ শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) আতুয়াজান পরগনার প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান জগন্নাথপুর থানার অন্তর্গত এই ভূখ- প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িত বলে স্থানীয় ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই মহান আউলিয়ার মাজারের নিদর্শন বড়ফেছি মৌজায় (গ্রামে) অবস্থিত ছিল। তাছাড়া, শেখ সুনাম উদ্দিন (সুনামদি)-এর পুত্রদের মধ্যে ইয়াজ উদ্দিনের নামে প্রাপ্ত একটি পাট্টা দলিলে দাওরাই অঞ্চলের আতুয়াজান পরগণায় ১,১৩৪ একর ভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। অপর পুত্র শেখ বিরাহিম (বিরামদি)-এর নামেও ভূমি-সনদ ও পত্তনি রেকর্ড বিদ্যমান। তিনিও পিতার ন্যায় পরগণাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর নামে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক ভূমি-সনদটি আজও সংরক্ষিত রয়েছে। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তাঁর রচিত “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত” গ্রন্থে লিখেছেন, “এই স্থানে প্রচুর পরিমাণে মৎস্য ধৃত হয় এবং তাহা শুষ্ক করিয়া ব্যবসায়ীগণ বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করে। সুনামগঞ্জ হইতে প্রচুর পরিমাণে ঘৃত রপ্তানি হইয়া থাকে। সুনামগঞ্জ বাজারের নামটি এইরূপ জনৈক ব্যবসায়ী কর্তৃক প্রদত্ত হয় বলিয়া শুনা যায়। এই বাজারের নামানুসারেই ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে শ্রীহট্ট জেলায় সুনামগঞ্জ সাবডিভিশন স্থাপিত হয়।” অন্যদিকে, ১৮৬১ বা ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের রহমত আলির তৌজি দলিলে ‘থানে বনগাঁও’ এবং ‘মু সুনামগঞ্জ’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হলো, ‘থানে বনগাঁও’ যদি ‘থানা বনগাঁও’ হয় এবং ‘মু সুনামগঞ্জ’ যদি ‘মহকুমা সুনামগঞ্জ’ নির্দেশ করে, তবে ১৮৬১ সালের এই দলিলটি কি ভুল? নাকি সুনামগঞ্জের ইতিহাসে ১৮৭৭ সালে মহকুমা প্রতিষ্ঠার সাল-সংক্রান্ত প্রচলিত তথ্যই ভুল? এ প্রশ্নের উত্তর পাঠকের বিচার-বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হলো। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তাঁর “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত” গ্রন্থে সুনামদিকে ‘সুনামদী সিপাহী’ আখ্যায়িত করে তাঁকে সুনামগঞ্জ শহরের জগন্নাথ দেবালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন (পরিশিষ্ট-ঞ, ভৌগোলিক বৃত্তান্ত, প্রথম ভাগ, নবম অধ্যায়)। তাঁর মতে, সুনামদী সিপাহী ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ওই দেবালয় নির্মাণ করেন। তবে সুনামগঞ্জ নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি সুনামদী সিপাহীর নাম একবারও উল্লেখ করেননি। শুধু তা-ই নয়, তিনি লিখেছেন, “সুনামগঞ্জে প্রায় ৩২টি পরগণা আছে; তন্মধ্যে আতুয়াজান, জাতুয়া, বানিয়াচঙ্গ (জোয়ার) প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত প্রাচীন, এবং এগুলির নামও কোনো কোনো ব্যবসায়ী-সংসৃষ্ট।” মূলত, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তাঁর গ্রন্থে সুনামগঞ্জ সম্পর্কে কয়েকটি লোকশ্রুতির উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর ঐতিহাসিক ভিত্তি সম্পর্কে তিনি নিজেও নিশ্চিত নন। তিনি আরও লিখেছেন, “কথিত আছে, পূর্বকালে এই জলময় স্থানে আতুয়া, জাতুয়া ও পাগল নামে চঙ্গজাতীয় তিন ব্যক্তি মৎস্য শিকারের জন্য আসিয়া, মৎস্যের প্রাচুর্য দৃষ্টে এই স্থানেই বাস করে। সেই বিরল-বসতিপূর্ণ স্থানে ইহারা মৎস্য আহরণের জন্য পরস্পরের মধ্যে এক-একটি সীমা নির্ধারণ করিয়া লইয়াছিল। একের চিহ্নিত সীমার ভিতরে অন্যে মৎস্য ধৃত করিত না। এই স্থানগুলিই পরে তাহাদের নামে খ্যাত হয় এবং পরবর্তীকালে এক-একটি পরগণায় পরিণত হয়।” এই কাহিনী উদ্ধৃত করার পর অচ্যুতচরণ চৌধুরী নিজেই লিখেছেন, “এই জনশ্রুতির মূলে কতদূর সত্য নিহিত আছে, বলা যায় না।” পাঠকের কাছে প্রশ্ন, যে জনশ্রুতির সত্যতা সম্পর্কে লেখক নিজেই নিশ্চিত নন, সেই কাহিনী তিনি সুনামগঞ্জের ইতিহাসে কেন স্থান দিলেন? এর ফলে সুনামগঞ্জের ইতিহাস সম্পর্কে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তিনি যে আতুয়া, জাতুয়া ও পাগল নামীয় তিন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তাঁদের মধ্যে আতুয়াজান ছিলেন একজন নারী। অথচ তাঁকে একজন পুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি বড় ধরনের ঐতিহাসিক ভুল এবং বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা। গবেষক এএসএম ওয়াজেদের মতে, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সফরসঙ্গী দিলাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর স্ত্রী আতুয়াজান বিবির নামানুসারেই আতুয়াজান পরগণার নামকরণ করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ মুমিনুল হক তাঁর “রাজনগরের ইতিবৃত্ত” গ্রন্থের ‘নামতত্ত্বে রাজনগর’ অংশে উল্লেখ করেছেন যে, দিলাল খাঁর নাম থেকে ‘দুলালী’ এবং তাঁর স্ত্রী আতুয়াজানের নাম থেকে ‘আতুয়াজান’ পরগণার নামকরণ হয়েছে। গবেষক এএসএম ওয়াজেদের মতে, এই দিলাল খাঁ-ই হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সফরসঙ্গী দিলাওর বখশ খতিব (রহ.)। অচ্যুতচরণ চৌধুরীর লেখায় ইতিহাসের একদিক যেমন আলোকিত, অন্যদিক তেমনি কিছুটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তাঁর গ্রন্থে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে অধিক স্থান পেয়েছে এবং তা বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। পক্ষান্তরে, মুসলমানদের ইতিহাস সেখানে খুবই সীমিত পরিসরে উপস্থাপিত হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তির নাম ছাড়া তাঁদের ইতিহাসের বিস্তৃত আলোচনা তেমন দেখা যায় না। এমনকি হাসন রাজার মতো একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বের বিষয়েও তিনি খুব সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। তাঁর বর্ণনায় হাসন রাজার মতো নন্দিত ব্যক্তিত্বও যেন দূর থেকে দেখা এক ঝলক আলোর মতো; ইতিহাসের মূল আলোচনায় নয়, বরং প্রান্তিক উল্লেখেই তাঁর উপস্থিতি সীমাবদ্ধ। আবার, যার পদধুলিতে সিলেট আজ পুণ্যভূমি হিসেবে সমাদৃত, সেই মহাপুরুষ হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর জীবন, কর্ম ও প্রভাব সম্পর্কেও বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায় না। (চলবে).....
(পূর্ব প্রকাশের পর)...
গবেষক সামারিন দেওয়ান রচিত হাসন রাজার জীবন ও কর্ম গ্রন্থের ৪২১তম পৃষ্ঠায় “সাবেক চৌধুরীগণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (বই নং ১)” অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দশসনা বন্দোবস্তের সময় লক্ষ্মণছিরি পরগণায় মোট ১২টি তালুক ছিল।” এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য। তবে তিনি দশসনা বন্দোবস্তের সময়ে সুনামদি নামে ১২ নম্বর তালুকের যে উল্লেখ করেছেন এবং সুনামদিকে ঘিরে যে ইতিহাস তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি ও দলিলগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আরও গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সামারিন দেওয়ান তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সুনামদি ছিলেন গভর্নমেন্ট-প্রেরিত খাসিয়া দমনকারী সেনাপতি মির্জা মুরাদ বেগের অনুচর। ১২ নম্বর তালুকটি ছিল অতীব দুর্গম ও জঙ্গলময়। ফলে লক্ষ্মণছিরির অন্যান্য মিরাসদারগণ এই জমির বন্দোবস্তে আগ্রহী হননি। এই সুযোগে মির্জা মুরাদ বেগ তাঁর অনুচর সুনামদিকে দিয়ে জমির বন্দোবস্ত করিয়ে সেখানে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। একটি বিষয়ে সবারই অবগত থাকা উচিত যে, সিলেট ভূমি রেকর্ডরুমে সংরক্ষিত দশসনা বন্দোবস্তের তৌজি দলিলে ২৪৬১০ নম্বর মহালের ক্ষেত্রে বন্দোব্সতগ্রহীতা কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায় না। সিলেট ভূমি রেকর্ডরুমে তল্লাশি করে জানা যায় যে, ১৮৬১ বা ১৮৬২ সালের তৌজি দলিলে মহাল নম্বর ২৪৬১০-এ “সুনামদি” না লিখে “সুনামগঞ্জ” লেখা হয়েছে। অথচ অন্যান্য মহালে ব্যক্তিনামের মাধ্যমে বন্দোবস্ত লিপিবদ্ধ রয়েছে। উক্ত মহালে “সুনামগঞ্জ” নামটি উল্লেখ থাকায় অনুমান করা যায় যে, এটি পূর্ব থেকেই সম্ভবত সুনাম উদ্দিনের মহাল বা তাঁর অধীনস্থ অঞ্চল ছিল। পরবর্তী সময়ে সুনাম উদ্দিন অনুপস্থিত থাকায় ১৭৮৯ সালের দশসনা বন্দোবস্তের সময় ওই অঞ্চল বা মহালটি “সুনামগঞ্জ” নামে তৌজিতে লিপিবদ্ধ করা হয়ে থাকতে পারে। মোহনপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত রহমতপুর গ্রামের বাসিন্দা রহমত আলি তাং-এর ১৮৬২ সালের তৌজি দলিল পাঠোদ্ধারে জানা যায় যে, থাক নং ২৮২৪, পরগণা লক্ষ্মণছিরি, মৌজা দ্বিতীয় খ- দারারগাঁও, মৌপ্রং, মৌজে ঢাকুয়ার হাওর, রহমতনগর ওরফে রহমতপুর, মোহনপুর, জয়নগর, সরদারপুর, আহমদপুর ও সাখাইতির উল্লেখ রয়েছে। তৌজিতে মহাল নম্বর ২৪৬০৯, রহমত আলি তাং (দশসনা) হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। এ মহালের হালমালিক হিসেবে মাং ছবদার, বলু কিয়ামদি প্রমুখের নামও উল্লেখ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, রহমত আলি তাং-এর দশসনা বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত তৌজি দলিলের একটি স্থানে “তৌজি লিখিত মহাল নম্বর ২৪৬০৯, রহমত আলি তাং, দশসনা” উল্লেখ রয়েছে। অথচ ২৪৬১০ নম্বর মহালের দশসনা দলিলের একই স্থানে “সুনামদি” বা “সুনাম উদ্দিন” লেখা হয়নি; বরং সেখানে “তৌজি লিখিত মহাল নম্বর ২৪৬১০, সুনামগঞ্জ, দশসনা” লেখা রয়েছে। এ থেকে আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ২৪৬১০ নম্বর মহালটি ১৭৮৯ সালে কোনো স্বতন্ত্র ব্যক্তির নামে বন্দোবস্ত হয়নি। বরং ১৬৬০ সালের পূর্বেই যে নাম অনুসারে “সুনামগঞ্জ”-এর নামকরণ হয়েছিল, দশসনা বন্দোবস্তের সময় সেই নামেই মহালটি তৌজিতে লিপিবদ্ধ করা হয়। হতে পারে, এই দশসনা বন্দোবস্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন মির্জা মুরাদ বেগ, যার কথা গবেষক সামারিন দেওয়ান তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। দাওরাই গবেষক এএসএম ওয়াজেদের মতে, ১৬৬০ সালের পূর্বেই সুনামগঞ্জ নামকরণ হওয়ায় ১৭৮৯ সালে এসে শেখ সুনাম উদ্দিনকে আর পাওয়া যায়নি। তাই উক্ত মহালের নাম “সুনামগঞ্জ” লেখা হয়েছে। তাঁর মতে, পূর্ববর্তী লেখকেরা সুনাম উদ্দিনকে নিয়ে যে ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন, তা সঠিক নয়; বরং তা বিকৃত ইতিহাস। তবে এটিও সত্য যে, সুনামগঞ্জ নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন ইতিহাসবিদ তাঁদের গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। ইতিহাসবিদ আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন তাঁর “সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য” গ্রন্থে লিখেছেন, মোগল সিপাহি সুনাম উদ্দিনের নামেই সুনামগঞ্জের নামকরণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সুনামগঞ্জ নামকরণের সঙ্গে যুক্ত শেখ সুনাম উদ্দিন, ওরফে সুনামদি, কোনো সিপাহি ছিলেন না। ১৬৬০ সালের মানচিত্রে বর্তমান জগন্নাথপুর থানার পূর্বাঞ্চল ‘আতুয়াজান পরগণা’ নামে পরিচিত ছিল। অন্যদিকে, বর্তমান সুনামগঞ্জ সদর এলাকার লক্ষ্মণছিরি ও চামতলা (বনগাঁও) পরগণা অঞ্চল ‘সুনামদি মহাল’, ‘সুনামগঞ্জ পরগণা’ বা ‘সুনামগঞ্জ মহাল’ নামে পরিচিত ছিল। এ অঞ্চলের পরগণাপতি ছিলেন শেখ সুনাম উদ্দিন, যিনি একজন সুফি সাধক ও দরবেশ হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষ শেখ দাওর বখশ খতিব (রহ.) আতুয়াজান পরগনার প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান জগন্নাথপুর থানার অন্তর্গত এই ভূখ- প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িত বলে স্থানীয় ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই মহান আউলিয়ার মাজারের নিদর্শন বড়ফেছি মৌজায় (গ্রামে) অবস্থিত ছিল। তাছাড়া, শেখ সুনাম উদ্দিন (সুনামদি)-এর পুত্রদের মধ্যে ইয়াজ উদ্দিনের নামে প্রাপ্ত একটি পাট্টা দলিলে দাওরাই অঞ্চলের আতুয়াজান পরগণায় ১,১৩৪ একর ভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। অপর পুত্র শেখ বিরাহিম (বিরামদি)-এর নামেও ভূমি-সনদ ও পত্তনি রেকর্ড বিদ্যমান। তিনিও পিতার ন্যায় পরগণাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর নামে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক ভূমি-সনদটি আজও সংরক্ষিত রয়েছে। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তাঁর রচিত “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত” গ্রন্থে লিখেছেন, “এই স্থানে প্রচুর পরিমাণে মৎস্য ধৃত হয় এবং তাহা শুষ্ক করিয়া ব্যবসায়ীগণ বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করে। সুনামগঞ্জ হইতে প্রচুর পরিমাণে ঘৃত রপ্তানি হইয়া থাকে। সুনামগঞ্জ বাজারের নামটি এইরূপ জনৈক ব্যবসায়ী কর্তৃক প্রদত্ত হয় বলিয়া শুনা যায়। এই বাজারের নামানুসারেই ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে শ্রীহট্ট জেলায় সুনামগঞ্জ সাবডিভিশন স্থাপিত হয়।” অন্যদিকে, ১৮৬১ বা ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের রহমত আলির তৌজি দলিলে ‘থানে বনগাঁও’ এবং ‘মু সুনামগঞ্জ’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হলো, ‘থানে বনগাঁও’ যদি ‘থানা বনগাঁও’ হয় এবং ‘মু সুনামগঞ্জ’ যদি ‘মহকুমা সুনামগঞ্জ’ নির্দেশ করে, তবে ১৮৬১ সালের এই দলিলটি কি ভুল? নাকি সুনামগঞ্জের ইতিহাসে ১৮৭৭ সালে মহকুমা প্রতিষ্ঠার সাল-সংক্রান্ত প্রচলিত তথ্যই ভুল? এ প্রশ্নের উত্তর পাঠকের বিচার-বিবেচনার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হলো। অচ্যুতচরণ চৌধুরী তাঁর “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত” গ্রন্থে সুনামদিকে ‘সুনামদী সিপাহী’ আখ্যায়িত করে তাঁকে সুনামগঞ্জ শহরের জগন্নাথ দেবালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন (পরিশিষ্ট-ঞ, ভৌগোলিক বৃত্তান্ত, প্রথম ভাগ, নবম অধ্যায়)। তাঁর মতে, সুনামদী সিপাহী ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ওই দেবালয় নির্মাণ করেন। তবে সুনামগঞ্জ নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি সুনামদী সিপাহীর নাম একবারও উল্লেখ করেননি। শুধু তা-ই নয়, তিনি লিখেছেন, “সুনামগঞ্জে প্রায় ৩২টি পরগণা আছে; তন্মধ্যে আতুয়াজান, জাতুয়া, বানিয়াচঙ্গ (জোয়ার) প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত প্রাচীন, এবং এগুলির নামও কোনো কোনো ব্যবসায়ী-সংসৃষ্ট।” মূলত, অচ্যুতচরণ চৌধুরী তাঁর গ্রন্থে সুনামগঞ্জ সম্পর্কে কয়েকটি লোকশ্রুতির উল্লেখ করেছেন, যেগুলোর ঐতিহাসিক ভিত্তি সম্পর্কে তিনি নিজেও নিশ্চিত নন। তিনি আরও লিখেছেন, “কথিত আছে, পূর্বকালে এই জলময় স্থানে আতুয়া, জাতুয়া ও পাগল নামে চঙ্গজাতীয় তিন ব্যক্তি মৎস্য শিকারের জন্য আসিয়া, মৎস্যের প্রাচুর্য দৃষ্টে এই স্থানেই বাস করে। সেই বিরল-বসতিপূর্ণ স্থানে ইহারা মৎস্য আহরণের জন্য পরস্পরের মধ্যে এক-একটি সীমা নির্ধারণ করিয়া লইয়াছিল। একের চিহ্নিত সীমার ভিতরে অন্যে মৎস্য ধৃত করিত না। এই স্থানগুলিই পরে তাহাদের নামে খ্যাত হয় এবং পরবর্তীকালে এক-একটি পরগণায় পরিণত হয়।” এই কাহিনী উদ্ধৃত করার পর অচ্যুতচরণ চৌধুরী নিজেই লিখেছেন, “এই জনশ্রুতির মূলে কতদূর সত্য নিহিত আছে, বলা যায় না।” পাঠকের কাছে প্রশ্ন, যে জনশ্রুতির সত্যতা সম্পর্কে লেখক নিজেই নিশ্চিত নন, সেই কাহিনী তিনি সুনামগঞ্জের ইতিহাসে কেন স্থান দিলেন? এর ফলে সুনামগঞ্জের ইতিহাস সম্পর্কে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তিনি যে আতুয়া, জাতুয়া ও পাগল নামীয় তিন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তাঁদের মধ্যে আতুয়াজান ছিলেন একজন নারী। অথচ তাঁকে একজন পুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি বড় ধরনের ঐতিহাসিক ভুল এবং বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা। গবেষক এএসএম ওয়াজেদের মতে, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সফরসঙ্গী দিলাওর বখশ খতিব (রহ.)-এর স্ত্রী আতুয়াজান বিবির নামানুসারেই আতুয়াজান পরগণার নামকরণ করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ মুমিনুল হক তাঁর “রাজনগরের ইতিবৃত্ত” গ্রন্থের ‘নামতত্ত্বে রাজনগর’ অংশে উল্লেখ করেছেন যে, দিলাল খাঁর নাম থেকে ‘দুলালী’ এবং তাঁর স্ত্রী আতুয়াজানের নাম থেকে ‘আতুয়াজান’ পরগণার নামকরণ হয়েছে। গবেষক এএসএম ওয়াজেদের মতে, এই দিলাল খাঁ-ই হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সফরসঙ্গী দিলাওর বখশ খতিব (রহ.)। অচ্যুতচরণ চৌধুরীর লেখায় ইতিহাসের একদিক যেমন আলোকিত, অন্যদিক তেমনি কিছুটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তাঁর গ্রন্থে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে অধিক স্থান পেয়েছে এবং তা বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। পক্ষান্তরে, মুসলমানদের ইতিহাস সেখানে খুবই সীমিত পরিসরে উপস্থাপিত হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তির নাম ছাড়া তাঁদের ইতিহাসের বিস্তৃত আলোচনা তেমন দেখা যায় না। এমনকি হাসন রাজার মতো একজন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বের বিষয়েও তিনি খুব সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। তাঁর বর্ণনায় হাসন রাজার মতো নন্দিত ব্যক্তিত্বও যেন দূর থেকে দেখা এক ঝলক আলোর মতো; ইতিহাসের মূল আলোচনায় নয়, বরং প্রান্তিক উল্লেখেই তাঁর উপস্থিতি সীমাবদ্ধ। আবার, যার পদধুলিতে সিলেট আজ পুণ্যভূমি হিসেবে সমাদৃত, সেই মহাপুরুষ হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর জীবন, কর্ম ও প্রভাব সম্পর্কেও বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায় না। (চলবে).....